নিজস্ব প্রতিনিধি, ময়ূরেশ্বর: বর্তমানের ঝকঝকে এসইউভি আর নিরাপত্তার ঘেরাটোপের বাইরেও যে রাজনীতির একটা অন্য পৃথিবী হয়, তার জীবন্ত উদাহরণ বীরভূমের ময়ূরেশ্বরের ধীরেন লেট। বয়স ৮০ পার হয়েছে, কিন্তু আদর্শের ধার কমেনি এক বিন্দুও। চারবারের বিধায়ক এবং জেলা পরিষদের প্রাক্তন সভাধিপতি হওয়া সত্ত্বেও আজও সাইকেলে চেপেই গ্রামের লাল মাটির রাস্তায় ছুটে বেড়ান এই বর্ষীয়ান বাম নেতা।
স্মৃতিতে সেই দিনলিপি
সাতের দশকে রাজনীতির ময়দানে পা রাখা ধীরেন লেট আজও ভুলতে পারেন না সেই সব দিনের কথা, যখন গ্রামের অধিকাংশ মানুষ তালপাতা আর খড়ের চালের ঘরে বাস করত। জোতদার-জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠাই ছিল তাঁর রাজনীতির দীক্ষা। ‘সহজ পাঠ’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মানুষের অধিকারের লড়াই লড়তে গিয়ে বহুবার তাঁকে পুলিশের মার আর জেলের ঘানি টানতে হয়েছে।
তৃণমূল ও অনুব্রতর কড়া সমালোচনা
বর্তমানের বীরভূমের রাজনীতি নিয়ে স্পষ্টবক্তা ধীরেন বাবু। এক সময় বীরভূমের ‘বেতাজ বাদশা’ অনুব্রত মণ্ডলের বাহিনীর হাতে চরম হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতির কথা মনে করে তিনি বলেন, "আমাকে কান ধরে ওঠবস করানো হয়েছিল যাতে আমি আর সিপিএম না করি। কিন্তু ওরা আমায় মারতে পেরেছে, মাথা নোয়াতে পারেনি।" আজ যখন সেই অনুব্রত মণ্ডল দুর্নীতির দায়ে কারান্তরালে, তখন ধীরেন লেটের চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তাঁর সোজাসাপ্টা কথা—"তৃণমূলের মন্ত্রী-নেতারা আজ দুর্নীতিতে ডুবে জেল খাটছেন, কিন্তু আমাদের সততাই আমাদের সবচেয়ে বড় মূলধন।"
অভাবের বিধায়ক, বিত্তহীন আদর্শ
রাজনীতি মানেই যখন কোটি টাকার সম্পদ, সেখানে ধীরেন লেটের জীবনযাপন এক বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। তিনি জানান, যখন বিধায়ক ছিলেন তখন সাম্মানিক পেতেন মাত্র ৫০০ টাকা। অধিবেশন চলাকালীন হাতখরচ আসত নামমাত্র। সেই ত্যাগের দিনগুলোই আজও তাঁকে মানুষের খুব কাছে রাখে। সাইকেলের টুং টাং শব্দে আজও ময়ূরেশ্বরের মানুষ চিনে নেয় তাদের পুরনো ‘কমরেড কে ।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ধীরেন লেট এক বিরল প্রজাতি। বীরভূমের রুক্ষ লাল মাটিতে তিনি আজও বামপন্থী আদর্শের শেষ প্রহরীদের একজন। শরীরে বয়সের ছাপ পড়লেও, কন্ঠস্বরে আজও সেই জেদ অটুট— "মানুষের পাশে ছিলাম, আছি আর থাকব।"


