নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুর:
ভোরবেলা ডিএসপি (DSP) কারখানার সেই চেনা সাইরেন কি আজ অন্য কোনো বার্তা দিচ্ছে? দুর্গাপুরের ধমনীতে যে ইস্পাত আর ঘাম মেশানো লড়াইয়ের ইতিহাস, তা যেন আজ আবার জেগে উঠেছে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে দুর্গাপুর পূর্ব কেন্দ্র এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গ্ল্যামার আর প্রতিশ্রুতির ভিড়ে বামেরা বেছে নিয়েছে এমন এক সেনাপতিকে, যাঁর পরিচয় কোনো বড় নেতার ড্রয়িংরুমে নয়, বরং কারখানার গেটে গেটে শ্রমিকের ঘামে লেখা হয়েছে।
কারখানার চিলতে রোদ আর এক লড়াকু জীবন: সীমান্ত চ্যাটার্জি
দুর্গাপুর পূর্বের এবারের মুখ সীমান্ত চ্যাটার্জি। তিনি কোনো তাত্ত্বিক নেতা নন, তিনি এক লড়াকু সৈনিক। হিন্দুস্থান স্টিল এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (HSEU) ঝান্ডা হাতে তাঁর জীবন কেটেছে ম্যানেজমেন্টের রক্তচক্ষুর সামনে।
আন্দোলনের ক্ষত: শ্রমিক স্বার্থে সরব হতে গিয়ে তাঁকে বারবার মাশুল দিতে হয়েছে। কর্মজীবনে একাধিকবার সাসপেনশনের খাঁড়া নেমে এসেছে তাঁর ওপর, ম্যানেজমেন্টের রোষানলে পড়ে ঘরছাড়া হতে হয়েছে। কিন্তু সীমান্তবাবু পিছু হটেননি।
অশ্রু ও জেদ: আজও কারখানার পুরনো শ্রমিকরা মনে করেন সেই দিনগুলোর কথা, যখন তাঁদের হকের লড়াইয়ে সবার আগে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন সীমান্তদা। আজ তিনি অবসরপ্রাপ্ত, কিন্তু তাঁর সেই আপসহীন মেজাজ আজও দুর্গাপুরের শ্রমজীবী মানুষের কাছে এক পরম ভরসা।
স্মৃতিতে মৃণাল-সন্তোষ: লড়াইয়ের সেই পুরনো ঘরানা
দুর্গাপুর পূর্বের মাটি চিরকালই বেইমানি করেনি সেই সব মানুষের সাথে, যারা মাটির কাছাকাছি থাকে।
"এই শহর ভোলেনি মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই দৃঢ়তা, ভোলেনি দিলীপ মজুমদারের অভিভাবকত্ব। এমনকি ২০১৬-র সেই উত্তাল ঝড়েও যখন চারদিকে ক্ষমতার হাতবদল হচ্ছিল, দুর্গাপুর পূর্বের মানুষ আঁকড়ে ধরেছিল প্রাক্তন শ্রমিক নেতা সন্তোষ দেবরায়কে।"
বামেদের দাবি, এই কেন্দ্রটি ঐতিহাসিকভাবেই শ্রমিকদের। আর তাই দীর্ঘ সময় পর আবারও কাস্তে-হাতুড়ি-তারা প্রতীকের সরাসরি লড়াই দুর্গাপুরের লাল ঝান্ডাকে এক নতুন আবেগ দিচ্ছে।
সিন্ডিকেট-মাফিয়া রাজ বনাম সাধারণের দীর্ঘশ্বাস
আজকের দুর্গাপুর বড়ই বিষণ্ণ। আকাশে কালো ধোঁয়ার আড়ালে ডালপালা মেলেছে লোহা আর বালি মাফিয়াদের দাপট। সিন্ডিকেট রাজের দাপটে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে নারী নিরাপত্তার এক গভীর হাহাকার। দুর্গাপুরের মায়েরা আজ ঘরে ফেরার সময় শঙ্কিত থাকেন।
এই অন্ধকার সময়ে মানুষ খুঁজছে এমন এক হাত, যা তাঁদের রক্ষা করবে। বামেদের রণকৌশল স্পষ্ট— "মাফিয়াদের ভয় দেখাতে পারে কেবল শ্রমিকের হাতুড়ি।" ---
শেষ কথা: দুর্গাপুর বাঁচানোর শপথ
ভোট আসবে, ভোট যাবে। কিন্তু দুর্গাপুর কি তার হারানো গরিমা ফিরে পাবে? যেখানে শ্রমিকের সম্মান ছিল সবার উপরে। সীমান্ত চ্যাটার্জির মতো একজন মানুষ যখন সাধারণের প্রতিনিধি হয়ে বিধানসভার লড়াইয়ে নামছেন, তখন এটি আর শুধু রাজনৈতিক ভোট থাকছে না— এটি হয়ে উঠছে আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই।
শিল্পাঞ্চলের আকাশে-বাতাসে এখন একটাই প্রশ্ন— "যিনি কারখানার ভেতরে ম্যানেজমেন্টের মাথা নত করিয়েছেন, তিনি কি পারবেন দুর্গাপুরের রাজপথ থেকে মাফিয়াদের বিদায় করতে?" উত্তর দেবে সময়, কিন্তু দুর্গাপুর পূর্বের মানুষ আজ আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।




