নয়াদিল্লি | বিশেষ সংবাদদাতা ভারতের দীর্ঘদিনের গর্ব 'স্বাধীন বিদেশনীতি' (Independent Foreign Policy) কি এখন মার্কিন নির্দেশনায় বা 'আমেরিকান ডিক্টেটে' পরিচালিত হচ্ছে? সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের আবহে রাশিয়ার তেল আমদানির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ভারতকে যে ৩০ দিনের 'বিশেষ ছাড়' (Waiver) দিয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক এখন তুঙ্গে। বিরোধী শিবির এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই ঘটনা ভারতের আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে খাটো করেছে।
১. মার্কিন 'ওয়েভার' ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের এই সাময়িক অনুমতিকে বিরোধীরা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। অভিযোগ উঠেছে যে, ভারত কোন দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করবে, তার সময়সীমা কেন আমেরিকা নির্ধারণ করে দেবে?
বিরোধীদের দাবি: এই ছাড় ভারতের কোনো কূটনৈতিক বিজয় নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন মার্কিন প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভরশীল।
বাস্তব চিত্র: ভারত একটি উন্নয়নশীল বৃহৎ শক্তি হওয়া সত্ত্বেও কেন বারবার মার্কিন 'অনুমতি'র তোয়াক্কা করছে, তা নিয়ে সংসদে সরব হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী দলগুলো।
২. ট্রাম্পের দাবি ও ভারতের 'নীরব' কূটনৈতিক অবস্থান
এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু বিস্ফোরক দাবি। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আকাশপথে ড্রোন ও যুদ্ধবিমান নিয়ে যখন চরম উত্তেজনা চলছিল, তখন তার একটি মাত্র ফোনেই যুদ্ধ থেমে গিয়েছিল।
"আমি বলেছিলাম যুদ্ধ থামাও, এবং তারা থামিয়ে দিল।" — ডোনাল্ড ট্রাম্প
যদিও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে, কিন্তু সমালোকচকরা বলছেন—বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। ট্রাম্পের সেই দাবি এবং বর্তমানের এই তেলের ওয়েভার একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পর্দার আড়ালে ভারতের ওপর মার্কিন চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
৩. ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব ও জ্বালানি কূটনীতি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী। এই সংকটে রাশিয়ার আটকে পড়া তেল (Stranded Oil) কেনার সুযোগ দিয়ে আমেরিকা আসলে ভারতকে নিজেদের বলয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
কৌশলগত চাপ: এই ছাড়ের আড়ালে ওয়াশিংটন ভারতকে চাপ দিচ্ছে যাতে দিল্লি রাশিয়ার বদলে মার্কিন তেল আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
সম্মানের হানি: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, "বন্ধুর ছদ্মবেশে" আমেরিকা আসলে ভারতের বিদেশনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের 'বিগ ব্রাদার' ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
৪. দেশীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব
এই ইস্যুতে এখন দিল্লির রাজপথ থেকে সংসদ—সবই সরগরম। অভিযোগ উঠেছে, সরকার মুখে 'আত্মনির্ভরতার' কথা বললেও কার্যত মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে। ভারতের সম্মান এবং বিদেশনীতির স্বাধীনতা কি তবে কেবলই কাগজে-কলমে রয়ে গেল? এই প্রশ্নই এখন সাধারণ মানুষের মনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।


