নয়াদিল্লি ও কলকাতা: পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার জেরে ভারতে এলপিজি (LPG) সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ইরান ও ইসরায়েল-আমেরিকা সংঘাতের কারণে 'স্ট্রেইট অফ হরমুজ' দিয়ে গ্যাস আমদানি ব্যাহত হওয়ায় দেশজুড়ে এই সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সংকটের মূল কারণ
ভারতের এলপিজি চাহিদার প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ মেটানো হয় সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানির মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে পণ্যবাহী জাহাজ আটকে পড়ায় সরবরাহ শিকল ভেঙে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ৬ মার্চ ভারত সরকার 'জরুরি ক্ষমতা' (Emergency Powers) প্রয়োগ করে ঘরোয়া উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।
জনজীবনে প্রভাব ও নতুন নিয়ম
সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং কালোবাজারি রুখতে সরকার ও তেল সংস্থাগুলো বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে:
২৫ দিনের নিয়ম: এখন থেকে একবার গ্যাস বুক করার পর পরবর্তী রিফিলের জন্য গ্রাহকদের কমপক্ষে ২৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে। আগে এই সময়সীমা ছিল ২১ দিন।
বাণিজ্যিক সরবরাহ বন্ধ: ৯ মার্চ থেকে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এলপিজি সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর ফলে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা ও গুরুগ্রামের মতো বড় শহরের রেস্তোরাঁগুলো বন্ধ হওয়ার মুখে।
কালোবাজারি: ঘরোয়া সিলিন্ডার সরবরাহেও ২ থেকে ৮ দিনের দেরি হচ্ছে। এই সুযোগে কালোবাজারে একটি সিলিন্ডারের দাম ১৫০০ টাকা পর্যন্ত উঠে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি
কলকাতায় গত কয়েক দিনে আতঙ্কিত হয়ে গ্যাস বুকিং করার (Panic Booking) হার ১৫-২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। প্রতিদিন প্রায় ১.৫ লক্ষ সিলিন্ডারের অর্ডার আসছে, যা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে বটলিং প্ল্যান্টগুলো। সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কায় সিলিন্ডার মজুত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যার ফলে খালি সিলিন্ডার সময়মতো ফেরত আসছে না। শিলিগুড়ি-সহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতেও নতুন ২৫ দিনের নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে।
সরকারের পদক্ষেপ
পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি আশ্বাস দিয়েছেন যে দেশে পর্যাপ্ত গ্যাসের মজুত রয়েছে। সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলি হলো:
১. উৎপাদন বৃদ্ধি: রিফাইনারিগুলোকে প্রোপেন ও বিউটেন ব্যবহার করে সর্বোচ্চ এলপিজি উৎপাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২. বিকল্প আমদানি: সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আমেরিকা, আলজেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নরওয়ে থেকে গ্যাস আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
৩. তদারকি কমিটি: রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার এবং গ্যাস মজুত না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে আমদানির সমস্যা দ্রুত না মিটলে সাধারণ মানুষের হেঁশেলের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


