নয়াদিল্লি, ১৪ এপ্রিল ২০২৬: কয়লা পাচার সংক্রান্ত প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট (পিএমএলএ) মামলায় আই-প্যাক (I-PAC)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিনেশ চন্দেলকে গ্রেফতার করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। সোমবার রাতে তাঁকে গ্রেফতারের পর দিল্লিতে একটি বিশেষ আদালতের বিচারকের বাসভবনে পেশ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সংবাদসংস্থা পিটিআই-এর একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, ইডি আধিকারিকরা কড়া পাহারায় বিনেশকে গাড়ি থেকে নামিয়ে বিচারকের বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন।
এই গ্রেফতারি রাজ্য তথা জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে।
গ্রেফতারের কারণ ও অভিযোগ
ইডির এই পদক্ষেপটি মূলত ২০২০ সালের একটি সিবিআই মামলার সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেডের খনি থেকে বিপুল পরিমাণ কয়লা চুরি হয়েছিল। তদন্তকারী সংস্থা ইডির দাবি, এই কয়লা পাচারের কালো টাকা ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আই-প্যাকের মাধ্যমে পাচার (মানি লন্ডারিং) করা হয়েছে। এর আগে এই মামলার সূত্র ধরেই কয়েকদিন আগে আই-প্যাকের অফিসে তল্লাশি অভিযান চালিয়েছিল ইডি। বিনেশ চন্দেলকে খুব শিগগিরই আদালতে পেশ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে তদন্তকারী সংস্থা।
আই-প্যাক এবং বিনেশ চন্দেলের ভূমিকা
২০১৩ সালে প্রশান্ত কিশোরের হাত ধরে 'ক্যাগ' (CAG) নামে যে সংস্থার পথচলা শুরু হয়েছিল, ২০১৪ সালের পর তা আই-প্যাক নামে আত্মপ্রকাশ করে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি, ২০১৫ সালে নীতীশ কুমার, ২০১৯ সালে জগন মোহন রেড্ডি এবং ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেতাদের বিপুল জয়ের নেপথ্যে এই সংস্থার ডেটা-চালিত এবং গ্রাসরুটস স্তরের নির্বাচনী কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
২০২১ সালে প্রশান্ত কিশোর নির্বাচনী কৌশলবিদের ভূমিকা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর আই-প্যাকের পুরো দায়িত্ব চলে আসে তিন সহ-প্রতিষ্ঠাতা—প্রতীক জৈন, ঋষি রাজ সিং এবং বিনেশ চন্দেলের হাতে। এই তিনজনের নেতৃত্বেই তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করছিল সংস্থাটি।
তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশলে ধাক্কা ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
২০১৯ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) নির্বাচনী মেশিনারির 'চোখ ও কান' হিসেবে কাজ করছে আই-প্যাক। ২০২৪ সালের লোকসভায় ২৯টি আসন জয়ের পর, ২০২৬-এর বিধানসভায় ২২৬+ আসন জয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাঠে নেমেছে ঘাসফুল শিবির।
বিনেশ চন্দেলের এই গ্রেফতারি তৃণমূলের সেই রণকৌশলে বড়সড় ধাক্কা বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ, টিএমসির বর্তমান কৌশলের মূল ভিত্তিগুলো আই-প্যাকেরই তৈরি করা:
মহিলা ভোট ও কল্যাণমূলক প্রকল্প: 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার'-এর মতো জনপ্রিয় প্রকল্প (যার ভাতা ২০২৬-এর ইশতেহার 'প্রতিজ্ঞা'-তে সাধারণ মহিলাদের জন্য ১৫০০ টাকা ও এসসি/এসটি-দের জন্য ১৭০০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে) এবং 'দুয়ারে সরকার'-এর মতো ডোর-টু-ডোর আউটরিচ।
দ্বৈত ক্যাম্পেইন বা Twin-Track Strategy: উত্তরবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগীয় সংযোগ এবং দক্ষিণবঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মসংস্থান ও 'নতুন বাংলা' ভিশনকে তুলে ধরা।
বুথ-লেভেল ম্যানেজমেন্ট: 'তৃণমূলে নব জোয়ার'-এর মতো গ্রাসরুটস ক্যাম্পেইন এবং ডেটা-ভিত্তিক প্রার্থী নির্বাচন।
আই-প্যাকের অফিসে ইডি অভিযানের পরই তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছিল যে, নির্বাচনের আগে তাদের মূল্যবান ডেটা ও নির্বাচনী রণকৌশল চুরি করার জন্যই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে ব্যবহার করছে বিজেপি। বিনেশ চন্দেলের গ্রেফতারির পর সেই অভিযোগ আরও জোরালো হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
আই-প্যাকের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিনেশ চন্দেলের গ্রেফতারির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। মামলার পরবর্তী শুনানির দিকেই এখন তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।


