আজ ১৪ এপ্রিল। ভারতের ইতিহাসে দিনটি শুধু ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়, এটি কোটি কোটি শোষিত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর দিন। সারা দেশে আজ দিনটি 'আম্বেদকর জয়ন্তী' বা 'ভীম জয়ন্তী' হিসেবে পরম শ্রদ্ধায় পালিত হচ্ছে। ১৯২৮ সালের ১৪ এপ্রিল পুনেতে জনার্দন সদাশিব রানাপিসাই প্রথমবার এই দিনটির উদযাপন শুরু করেছিলেন, যা আজ নিছক কোনো স্মরণসভা নয়, বরং এক জাতীয় অধিকার আদায়ের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে দিনটি দেশে সরকারি ছুটির মর্যাদা পেয়েছে। আজকের দিনে তাঁর মূর্তিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ বা রাজপথের মিছিল কেবল কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সাম্য, শিক্ষা এবং দলিত অধিকার আদায়ের এক নীরব, অথচ বজ্রকঠিন শপথ।
হাজার বছরের পুঞ্জীভূত অন্ধকার, যুগ যুগ ধরে জমা হওয়া লাঞ্ছনা আর নীরব অশ্রুর যদি কোনো কণ্ঠস্বর থাকে, তবে তার নাম ডঃ ভীম রাও আম্বেদকর। ভারতের বুকে 'অস্পৃশ্যতা' নামক যে বিষবৃক্ষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল, সেই বিষবৃক্ষের শিকড় উপড়ে ফেলার এক জলজ্যান্ত মহাকাব্যের নাম আম্বেদকর। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি এক জ্বলন্ত বিদ্রোহ।
অপমান থেকে উত্থান: এক তৃষ্ণার্ত বালকের লড়াই
একটু ভেবে দেখুন সেই ছোট্ট ছেলেটির কথা। তীব্র গরমে ছটফট করছে তৃষ্ণার্ত বুক, অথচ স্কুলের জলের পাত্র ছোঁয়ার অধিকার তার নেই! কারণ তার জন্ম তথাকথিত 'নিচু' বা 'মহর' ঘরে। ক্লাসরুমের বাইরে, ধুলোমাখা মেঝেতে চটের ওপর বসে যে শিশুটি অপমান হজম করেছিল, সেদিন কেউ বোঝেনি ওই ধুলো থেকেই জন্ম নিচ্ছে এক কালবৈশাখী।
পশুর চেয়েও অধম জীবনযাপন করা এক বিশাল জনগোষ্ঠীর বুকফাটা আর্তনাদকে তিনি নিজের বুকে ধারণ করেছিলেন। উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেও যখন জাতপাতের কারণে তাঁকে অফিস থেকে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল, তখন তাঁর ভেতরের ক্ষোভ কান্নায় নয়, পরিণত হয়েছিল এক ইস্পাতকঠিন প্রতিজ্ঞায়। তিনি বুঝেছিলেন, এই সমাজ দয়া করবে না; অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে।
শম্বুক বধ: পৌরাণিক শোষণের এক করুণ অধ্যায়
আম্বেদকরের এই লড়াইয়ের কারণ বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায়গুলোর দিকে, যা ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার মোড়কে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। রামায়ণের পাতায় লুকিয়ে থাকা 'শম্বুক বধ'-এর ঘটনাটি ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণব্যবস্থার এক নিষ্ঠুর ও জ্বলন্ত প্রমাণ।
রামায়ণের কাহিনী অনুসারে, একজন শূদ্র হয়েও তপস্যা বা আধ্যাত্মিক সাধনা করার 'অপরাধে' ভগবান রামচন্দ্রের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল শম্বুককে। কারণ এক ব্রাহ্মণের সন্তানের অকালমৃত্যুর দায় চাপানো হয়েছিল একজন নিম্নবর্ণের মানুষের তপস্যার ওপর! ব্রাহ্মণ্যবাদের এই নির্মম বিচারব্যবস্থাকেই বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন ডঃ আম্বেদকর। শম্বুকের মৃত্যু প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সমাজে ঈশ্বর আরাধনা, জ্ঞান অর্জন বা আধ্যাত্মিক সাধনার অধিকারও কীভাবে একটি নির্দিষ্ট বর্ণের কুক্ষিগত ছিল। আম্বেদকরের সারা জীবনের লড়াই ছিল এই পৌরাণিক মানসিকতার শিকড় উপড়ে ফেলে শম্বুকদের তাদের ছিনিয়ে নেওয়া অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
সংবিধান: শোষিতের রক্ষাকবচ ও মুক্তির দলিল
যে সমাজ তাঁকে জল খেতে দেয়নি, যে সমাজ তাঁর ছায়াকে অপবিত্র মনে করত, সেই সমাজেরই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কলম উঠল তাঁর হাতে! এ কোনো রূপকথা নয়, এ হলো প্রতিশোধের সবচেয়ে সুন্দর ও অহিংস রূপ। ভারতের সংবিধান শুধু কয়েকটি আইনের সমষ্টি নয়; এটি হাজার বছর ধরে পদদলিত মানুষের চোখের জলে লেখা এক মুক্তির দলিল।
তিনি যখন সংবিধানের খসড়া তৈরি করছিলেন, তখন তাঁর কলমের প্রতিটা আঁচড়ে মিশে ছিল সেইসব শ্রমজীবী, দলিত ও প্রান্তিক মানুষের স্বপ্ন, যারা চিরকাল শুধু শোষিতই হয়েছে। তিনি এমন এক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা হবে ধর্মনিরপেক্ষ, যেখানে থাকবে না কোনো জাতের বড়াই, থাকবে না কোনো অস্পৃশ্যতার শৃঙ্খল। তিনি শিখিয়েছিলেন— "অধিকার কেউ স্বেচ্ছায় দেয় না, তা লড়াই করে অর্জন করতে হয়। মনে রেখো, ছাগলকে বলি দেওয়া হয়, সিংহকে নয়!"
অসমাপ্ত লড়াই: কেন তাঁকে আজও প্রয়োজন?
আজকের দিনে দাঁড়িয়েও যখন আমরা দেখি মন্দিরে প্রবেশের অপরাধে বা একটু ভালো পোশাক পরার কারণে কাউকে মারধর করা হচ্ছে, তখন বুকের ভেতরটা ডুকরে ওঠে। আজও সমাজের আনাচে-কানাচে, এমনকি তথাকথিত আধুনিকতার মোড়কেও লুকিয়ে আছে সেই পুরোনো ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতা। আজও শম্বুকদের অন্য কোনো রূপে, অন্য কোনোভাবে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চক্রান্ত চলে।
সংবিধানের ওপর যখন বারবার আঘাত আসে, রাষ্ট্রের চরিত্র যখন নিরপেক্ষতা হারিয়ে বিভাজনের দিকে হেলে পড়ে, তখন আম্বেদকরকে বড় বেশি প্রয়োজন হয়। তিনি শুধু ১৪ এপ্রিলের মালা পরানোর কোনো মূর্তি নন; তিনি হলেন সেই প্রদীপ্ত আলোকবর্তিকা, যা ঘোর অন্ধকারেও পথ দেখায়।
আজকের সমাজে নতুন করে এক নবজাগরণের প্রয়োজন। যে নবজাগরণ ভাঙবে জাতপাতের প্রাচীর, ফিরিয়ে আনবে মানুষের হারানো সম্মান। আম্বেদকর কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নেতা নন; যারা জীবনে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, যারা শোষণের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে চান— তিনি তাদের সবার। ভীম জয়ন্তীর এই পবিত্র লগ্নে তাঁর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস আজও আমাদের কানে কানে বলে যায়— "শিক্ষিত হও, সংগঠিত হও, সংগ্রাম করো!"


