সামনেই মহান মে দিবস। শিকাগোর রাজপথে বুকের রক্ত দিয়ে শ্রমিক শ্রেণি যে ৮ ঘণ্টার কর্মদিবস এবং ন্যায্য অধিকার ছিনিয়ে এনেছিল, আজ দেশজুড়ে সেই অধিকারগুলোকেই ভেঙে ফেলার এক গভীর চক্রান্ত চলছে। মালিকপক্ষের এই অমানবিক শোষণ এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জ্বলন্ত প্রতিবাদ হয়ে উঠেছে উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপুরে ভি-গার্ড (V-Guard) কারখানার শ্রমিকদের সাম্প্রতিক আন্দোলন।
গত ২৪শে এপ্রিল, ২০২৬ থেকে উত্তরাখণ্ডের পান্তনগর সিডকুল (SIDCUL) শিল্পাঞ্চলে ভি-গার্ড কনজিউমার প্রোডাক্টস লিমিটেডের কারখানায় মজুরি বৃদ্ধি এবং কাজের ন্যূনতম পরিবেশের দাবিতে এক ব্যাপক ধর্মঘট শুরু করেছেন শ্রমিকরা।
শ্রমিকদের মূল দাবি এবং ক্ষোভের কারণ
মে দিবসের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে ভি-গার্ড কারখানার ভেতরের চিত্রটি শ্রমিক শোষণের এক নগ্ন উদাহরণ। শ্রমিকদের মূল দাবিগুলো হলো:
মজুরি বৃদ্ধি: বর্তমানে শ্রমিকদের মাত্র ৯,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা মাসিক বেতনে কাজ করানো হচ্ছে। বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনির পরও কোনো ইনক্রিমেন্ট নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশছোঁয়া দামের মাঝে এই সামান্য বেতনে পরিবার চালানো কার্যত অসম্ভব। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যূনতম মজুরির আশ্বাস অনুযায়ী তারা মাসিক বেতন ২০,০০০ টাকা করার দাবি তুলেছেন।
স্থায়ী নিয়োগের অভাব: এই কারখানায় হাজার হাজার চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক কাজ করেন, যাদের অধিকাংশই তরুণী। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল কারখানায় একজনও স্থায়ী কর্মী নেই।
আইনসম্মত ওভারটাইম (OT): ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করালে আইন অনুযায়ী 'ডাবল ওভারটাইম' বা দ্বিগুণ মজুরি প্রদানের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ক্যান্টিন ও অন্যান্য সুবিধা: কারখানার ক্যান্টিনের খাবারের মান এবং পরিচালনা নিয়ে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে, যার অবিলম্বে উন্নতি প্রয়োজন।
পুলিশি নিগ্রহ এবং প্রশাসনের ভূমিকা
২৪শে এপ্রিল কারখানা গেটে অবস্থান বিক্ষোভ চলাকালীন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর পুলিশ বলপ্রয়োগ করে, যার জেরে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হন এবং অনেকে জ্ঞান হারান। ২৬শে এপ্রিল পুলিশ গান্ধী পার্ক থেকে ৫ জন আন্দোলনকারীকে আটক করলে উত্তেজনা আরও বাড়ে। যদিও পরে ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়ন এবং অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনের চাপে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
শ্রম দপ্তরের আধিকারিক (ALC) অরবিন্দ সাইনির উপস্থিতিতে কোম্পানি ম্যানেজমেন্ট ও শ্রমিকদের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন যে মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে একটি সম্মতি তৈরি হয়েছে, যা সরকারি স্তরের কমিটির বৈঠকের পর চূড়ান্ত হবে। কিন্তু দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার শ্রমিকরা আর ফাঁকা মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রাখতে রাজি নন; তাঁরা সুস্পষ্ট লিখিত চুক্তির দাবিতে অনড়।
সিটু (CITU) ও রাজনৈতিক মহলের সমর্থন
এই শ্রমিক অসন্তোষ এখন আর কারখানার চার দেওয়ালে আটকে নেই। গত ২৭শে এপ্রিল সেন্টার অফ ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (CITU)-এর একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তাঁরা শ্রমিকদের এই ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়ে স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, ভি-গার্ড কারখানায় প্রতিনিয়ত মৌলিক শ্রম আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
পাশাপাশি, প্রাক্তন বিধায়ক ও কংগ্রেস নেতা রাজকুমার ঠুকরাল বিক্ষোভস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং ম্যানেজমেন্ট ও পুলিশের সাথে কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিল্পোন্নয়নে শ্রমিকদের অবদান অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই এবং তাঁদের এই দাবি শতভাগ ন্যায্য।
মে দিবসের ঠিক আগে ভি-গার্ড শ্রমিকদের এই আন্দোলন সমগ্র দেশের শ্রমিক শ্রেণির কাছে এক বড় বার্তা। যখন ৮ ঘণ্টার কাজের অধিকার এবং আইনি সুরক্ষা কেড়ে নিয়ে শ্রমিকদের পুনরায় দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধার চেষ্টা চলছে, তখন এই তরুণী ও চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ লড়াই প্রমাণ করছে—অধিকার কেউ উপহার দেয় না, অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়। লিখিত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় ভি-গার্ডের লড়াকু শ্রমিকরা।


