উঁচু উঁচু ইমারত আর বিলাসবহুল শহরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক করুন কান্না আজ গগনভেদী। হাড়ভাঙা খাটুনির পর দিনে ৪৫০ টাকাও জোটে না—এই অমানবিক বাস্তবতার প্রতিবাদে পথে নেমেছিলেন নয়ডার কারখানার শ্রমিকরা। পেটের জ্বালা আর পরিবারের মুখে দু'মুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার এই বাঁচার লড়াইকে প্রশাসন যেভাবে নির্মমভাবে স্তব্ধ করতে চাইল, তা দেখে শিউরে উঠছে গোটা দেশ।
বিনা অপরাধে অত্যাচার ও কান্নার রোল
ন্যায্য পাওনার দাবিতে রাস্তায় নামাটা কি অপরাধ? এই প্রশ্নটাই আজ তাড়া করে বেড়াচ্ছে নয়ডার শ্রমিক মহল্লাগুলোকে। পুলিশি অভিযানের নামে যা চলল, তা এক কথায় অমানবিক। রাতের অন্ধকারে গ্রামে গ্রামে ঢুকে গরিব শ্রমিকদের নির্বিচারে পেটানো হয়েছে। রেহাই পাননি বাড়ির মহিলারাও। পুলিশের লাঠির ঘায়ে রক্তাক্ত হয়েছেন অধিকার বুঝে নিতে চাওয়া শত শত খেটে খাওয়া মানুষ।
সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য হলো পরিবারগুলোর হাহাকার। ঘরের মানুষটাকে পুলিশ কোথায় টেনে নিয়ে গেল, তা জানেন না দিশেহারা মা-স্ত্রী-সন্তানরা। থানা আর হাসপাতালের চক্কর কাটতে কাটতে তাঁদের চোখের জল আজ শুকিয়ে গেছে।
যাঁরা পাশে দাঁড়ালেন, তাঁদেরও কণ্ঠরোধ
শ্রমিকদের এই কান্নায় যাঁরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথে নেমেছিলেন, সেই বামপন্থী নেতাদের ওপরও নেমে এসেছে প্রশাসনের খাঁড়া। সিটু (CITU) এবং সিপিআই(এম) নেতাদের অপরাধ একটাই—তাঁরা এই শোষিত মানুষগুলোর হয়ে কথা বলতে এসেছিলেন।
কোথায় কমরেড রাম স্বরথ? নয়ডা জেলার সিটু নেতা কমরেড রাম স্বরথকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে, অথচ প্রশাসন তাঁর ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চুপ। উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাঁর পরিজন ও সহযোদ্ধাদের।
গৃহবন্দি নেতৃত্ব: সিপিআই(এম) নেতা কমরেড গগনেশ্বর দত্ত শর্মাকে তাঁর নিজের ঘরেই বন্দি করে রাখা হয়েছে।
জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া: শ্রমিকদের হয়ে কথা বলতে আসা দিল্লির সিটু নেতা পি ভি অনিয়ন এবং বীরেন্দ্র গৌড়কেও ডিএম অফিসের সামনে থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে সিপিআই(এম)-এর প্রবল বিক্ষোভের মুখে তাঁদের ছাড়তে বাধ্য হয় প্রশাসন।
বাধা পেরিয়ে প্রতিবাদের আগুন
সব পথ বন্ধ করে, ব্যারিকেড দিয়েও আটকানো যায়নি প্রতিবাদের এই আগুন। সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল যখন নয়ডায় ঢোকার চেষ্টা করে, পুলিশ তাঁদের চিল্লা সীমান্তে আটকে দেয়। কিন্তু হার মানেননি তাঁরা। রাস্তায় বসেই শুরু হয় ধর্না। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর প্রশাসনের কর্তারা ছুটে আসেন, বেআইনি গ্রেপ্তার বন্ধের আশ্বাস দেন। কিন্তু যে শ্রমিকরা একটু ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, তাঁদের মজুরির দাবিটা আজও অবহেলিত।
গোটা নয়ডাকে আজ যেন এক পুলিশি দুর্গে পরিণত করা হয়েছে। সমাজবাদী পার্টি বা কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলিকেও প্রশাসন গায়ের জোরে আটকে দিয়েছে।
মিথ্যা মামলা আর নিষ্ঠুর পরিহাস
পেটের দায়ে রাস্তায় নামা প্রায় ৪০০ জন গরিব শ্রমিকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে দাঙ্গা আর মারধরের মতো গুরুপাক মিথ্যা মামলা (এফআইআর)। পুলিশ বলছে, এসব নাকি কোনো 'সিন্ডিকেট'-এর চক্রান্ত! অথচ, যাঁরা দিনরাত কারখানার ধোঁয়ায় শ্বাস নেন আর ঘাম ঝরান, তাঁরা জানেন এই লড়াই শুধু আর একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার লড়াই।
শেষ না হওয়া এক লড়াই
সিপিআই(এম) ও অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনগুলি আজ একটাই দাবিতে সরব—অবিলম্বে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নিরীহ শ্রমিকদের মুক্তি দিতে হবে। নয়ডার এই আন্দোলন শুধু মজুরি বৃদ্ধির দাবি নয়, এটি মানুষের মতো মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকারের লড়াই। পুলিশের লাঠি আর জেলের গরাদ হয়তো সাময়িকভাবে রাস্তা ফাঁকা করে দিয়েছে, কিন্তু শ্রমিকদের বুকের ভেতরের আগুন আর স্বজন হারানোর কান্না এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়।


