ছতরপুর ও পান্না, মধ্যপ্রদেশ: ভারতের প্রথম নদী সংযোগ প্রকল্প ‘কেন-বেতবা লিঙ্ক প্রজেক্ট’ (KBLP) ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর ও পান্না জেলা। নিজেদের ঘরবাড়ি এবং জমি হারানোর আশঙ্কায় কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভে সামিল হয়েছেন কয়েক হাজার আদিবাসী ও কৃষক। আন্দোলনের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, প্রকল্পের প্রধান অংশ ‘দৌধন বাঁধ’ (Daudhan Dam)-এর কাজ আপাতত বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন।
মরণপণ লড়াই: 'চিতা আন্দোলন' ও 'জল সত্যাগ্রহ'
সম্প্রতি বিক্ষোভের এক চরম রূপ দেখা গিয়েছে পান্না ও ছতরপুর সীমান্তে। গত ৮ এপ্রিল ২০২৬-এ স্থানীয় গোন্দ ও কোল সম্প্রদায়ের শত শত নারী দৌধন বাঁধের পাশে কাঠের চিতা সাজিয়ে তার ওপর শুয়ে পড়েন। এই ‘চিতা আন্দোলন’-এর মাধ্যমে তাঁরা সরকারকে বার্তা দেন যে, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া তাঁদের কাছে মৃত্যুর সমান। আন্দোলনকারীদের কণ্ঠে ছিল একটাই স্লোগান— "হয় বিচার দাও, নয় মৃত্যু"।
চিতা আন্দোলনের পাশাপাশি বহু বিক্ষোভকারী কেন নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ‘জল সত্যাগ্রহ’ শুরু করেন। পুলিশের লাঠিচার্জ এবং জলকামান ব্যবহারের অভিযোগ উঠলেও আন্দোলনকারীরা পিছু হঠতে নারাজ।
বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি
সামাজিক কর্মী ও ‘জয় কিষাণ সংগঠন’-এর নেতা অমিত ভটনাগর-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলো হলো:
ন্যায্য ক্ষতিপূরণ: প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে কমপক্ষে ১২.৫ লক্ষ টাকা করে এককালীন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
পুনর্বাসন: ২০১৩ সালের ভূমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী স্বচ্ছ এবং সম্মানজনক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিবেশ ও অরণ্য রক্ষা: পান্না টাইগার রিজার্ভের বড় অংশ ডুবে যাওয়ার ফলে বনজ সম্পদের যে ক্ষতি হবে, তা নিয়ে আদিবাসীদের উদ্বেগ নিরসন করতে হবে।
সরাসরি আলোচনা: আন্দোলনকারীরা স্থানীয় তশিলদার বা নিচুতলার আধিকারিকদের বদলে সাগর ডিভিশনাল কমিশনারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার দাবিতে অনড়।
প্রকল্পের প্রভাব ও উদ্বেগ
৪৪,০০০ কোটি টাকার এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের লক্ষ্য কেন নদীর অতিরিক্ত জল বেতবা নদীতে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বুন্দেলখণ্ডের খরাপ্রবণ এলাকায় চাষের জল ও পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া।
অন্তত ২৪টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রায় ৭,০০০ পরিবার সরাসরি বাস্তুচ্যুত হওয়ার মুখে।
পান্না টাইগার রিজার্ভের একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৬,০০০ হেক্টর বনভূমি) জলের তলায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন করে জরিপ চালানোর এবং ক্ষতিপূরণ খতিয়ে দেখার আশ্বাসে ১৬ এপ্রিল আন্দোলন ১০ দিনের জন্য স্থগিত করা হলেও উত্তেজনা কমেনি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, খাতা-কলমে উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে তাঁদের রুজি-রুটি ও ঐতিহ্যের কোনো তোয়াক্কা করছে না সরকার। যদি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হয়, তবে পুনরায় বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আদিবাসী কৃষকরা।


