কলকাতা: আগামী ২৯শে এপ্রিল হাইভোল্টেজ নির্বাচন। ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছে, কলকাতা বন্দর (পূর্বতন গার্ডেনরিচ) বিধানসভা কেন্দ্রে উত্তাপ ততই বাড়ছে। তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই কেন্দ্রে এবার শাসক দলকে কড়া চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে বদ্ধপরিকর বাম শিবির। হেভিওয়েট তৃণমূল প্রার্থী ফিরহাদ হাকিমের বিরুদ্ধে এই কেন্দ্রে এবার বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআইএম প্রার্থী ফৈয়াজ আহমেদ খান। বিগত এক দশক ধরে তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও, এবারের নির্বাচনে সিপিআইএম-এর প্রচার কৌশলে বেশ কিছু নতুন এবং আক্রমণাত্মক দিক উঠে আসছে।
সিপিআইএম শিবিরের অন্দরমহল এবং তাদের প্রচারের মূল অভিমুখ বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে সামনে আসছে:
১. "দুর্ঘটনা নয়, সিন্ডিকেটের হত্যা": বহুতল বিপর্যয়কে মূল হাতিয়ার
গত ১৭ই মার্চ, ২০২৪-এ গার্ডেনরিচে নির্মীয়মাণ বহুতল ভেঙে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনাকে শুধুমাত্র 'দুর্ঘটনা' বলতে নারাজ সিপিআইএম। ফৈয়াজ আহমেদ খানের প্রচারে এই ইস্যুটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সিপিআইএম নেতৃত্বের সরাসরি অভিযোগ, শাসক দলের মদতপুষ্ট প্রোমোটার রাজ এবং স্থানীয় প্রশাসনের দুর্নীতির কারণেই এই 'মৃত্যুফাঁদ' তৈরি হয়েছিল। বামেদের দাবি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যে খেটে খাওয়া মানুষগুলো প্রাণ হারিয়েছেন, তৃণমূল পরিচালিত পুরসভা এবং স্থানীয় বিধায়ক তার দায় এড়াতে পারেন না। বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে এই ক্ষোভকে ব্যালট বাক্সে প্রতিফলিত করতে চাইছে লাল শিবির।
২. ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ: "গণতন্ত্র লুঠের ষড়যন্ত্র"
স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR)-এর পর কলকাতা বন্দর এলাকার প্রায় ২২.৩% ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া নিয়ে তোলপাড় চলছে। সিপিআইএম একে সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, এটি শাসক দলের একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। যে সমস্ত এলাকায় তৃণমূল বিরোধী ক্ষোভ বেশি, মূলত সেখান থেকেই বেছে বেছে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে বাম নেতৃত্ব দাবি করছেন। ফৈয়াজ আহমেদ খান এই অধিকার হারানো মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে সিপিআইএম-এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে।
৩. দুর্নীতি বনাম স্বচ্ছতার লড়াই
তৃণমূলের বিপুল আর্থিক ক্ষমতা এবং ডক এলাকার তথাকথিত 'মাফিয়া' নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সিপিআইএম তাদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরছে। ফৈয়াজ আহমেদ খান নিজে প্রাক্তন কাউন্সিলর হওয়ায় এলাকার মানুষের সাথে তার নিবিড় জনসংযোগ রয়েছে। তৃণমূলের মেগা-র্যালির বিপরীতে সিপিআইএম জোর দিচ্ছে পাড়ায় পাড়ায় ছোট পথসভা, ডোর-টু-ডোর ক্যাম্পেইন এবং নিবিড় জনসংযোগের ওপর।
৪. বিজেপি নয়, আসল বিরোধী বামেরাই
২০২১ সালের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে সরাসরি কোনো বাম প্রার্থী ছিল না। তবে ২০২৬-এ পরিস্থিতি ভিন্ন। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই এলাকায় বিজেপি সেভাবে কখনোই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারেনি। সিপিআইএম প্রচার করছে যে, তৃণমূলের বিকল্প কখনোই বিজেপি হতে পারে না। এলাকার ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখা এবং শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার রক্ষার জন্য বামপন্থীদেরই একমাত্র বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কলকাতা বন্দর কেন্দ্রে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত্তি এবং গত নির্বাচনে প্রায় ৪৫% জয়ের ব্যবধান ভেঙে দেওয়া সিপিআইএম-এর পক্ষে নিঃসন্দেহে একটি কঠিন কাজ। তবে, বহুতল বিপর্যয়ের স্মৃতি এখনও দগদগে এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে।
বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআইএম প্রার্থী ফৈয়াজ আহমেদ খান যদি এই প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোট এবং ক্ষুব্ধ সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি বড় অংশকে নিজেদের বাক্সে টানতে পারেন, তবে ২৯শে এপ্রিলের নির্বাচনে গার্ডেনরিচের ফলাফল শাসক দলের জন্য যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তৃণমূলের দুর্গে লাল ঝান্ডা কতটা ফাটল ধরাতে পারল, তার উত্তর মিলবে আগামী ৪ মে।


