কলকাতা | ৮ এপ্রিল, ২০২৬
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজার আগেই এক অভাবনীয় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে পশ্চিমবঙ্গ। ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ার শেষে রাজ্যজুড়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ৯০.৮৩ লক্ষ নাম। এই বিপুল ছাঁটাই কেবল শাসক দল তৃণমূল বা প্রধান বিরোধী দল বিজেপির জন্যই নয়, বরং কয়েক বছর ধরে বিধানসভায় ‘শূন্য’ হয়ে থাকা বামফ্রন্টের সামনেও এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে।
📊 ভোটার সংশোধন ২০২৬: মূল পরিসংখ্যান
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ভোটার সংখ্যা ৭.৬৬ কোটি থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ৬.৭৫ কোটি-তে দাঁড়িয়েছে। নাম বাতিলের প্রধান তিনটি ক্ষেত্র হলো:
মৃত ভোটার: ২৪.১৬ লক্ষ
অনুপস্থিত/স্থানান্তরিত (Shifted): ৩২.৬৫ লক্ষ (বিএলও-দের ৩ বার পরিদর্শনের পর)
ডুপ্লিকেট ও ভুয়া তথ্য: ১.৩৮ লক্ষ
এই বিশাল সংশোধন সম্পন্ন হয়েছে দুটি পর্যায়ে। প্রথম পর্যায়ে খসড়া তালিকায় ৫৮.২ লক্ষ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার (Adjudication) মাধ্যমে আরও ২৭.১৬ লক্ষ নাম চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়।
📍 জেলাভিত্তিক নাম বাতিলের তালিকা ও বামেদের সম্ভাবনা
সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে সীমান্ত সংলগ্ন এবং সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলোতে, যা বাম-কংগ্রেস জোটের (SDA) জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
| জেলা | ছাঁটাই (Adjudication) | SDA ভোট (২০২৪ LS) | বামেদের সম্ভাব্য সুবিধা |
| মুর্শিদাবাদ | ৪,৫৫,১৩৭ | ১৩.৮৬ লক্ষ | শাসক দলের একাধিপত্য কমলে বাম-কংগ্রেস জোটের ফেরার পথ প্রশস্ত হবে। |
| উত্তর ২৪ পরগণা | ৩,২৫,৬৬৬ | ৫.৯৩ লক্ষ | শিল্পাঞ্চল ও চটকল এলাকায় ভুয়া ভোটার কমলে বাম ইউনিয়নগুলোর প্রভাব বাড়বে। |
| মালদা | ২,৩৯,৩৭৫ | ৯.৫৭ লক্ষ | প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূল থেকে বাম-কংগ্রেসের দিকে ফেরার সম্ভাবনা। |
| কলকাতা | ২৫.৫% (সামগ্রিক) | ২.৮৪ লক্ষ | শহুরে মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে বামেদের গুরুত্ব বৃদ্ধি। |
অন্যান্য তথ্য: কলকাতার জোড়াসাঁকো (৩৬.৮%) ও চৌরঙ্গী (৩৫.৬%) কেন্দ্রে সর্বোচ্চ এবং পূর্ব মেদিনীপুরে (৩.৩%) সর্বনিম্ন নাম কাটা গেছে।
🚩 শূন্যের গেরো কাটাতে বামেদের ত্রিফলা কৌশল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘শুদ্ধিকরণ’ বামেদের দীর্ঘদিনের আসন খরা কাটাতে সহায়ক হতে পারে:
‘ছাপ্পা ভোট’ নিয়ন্ত্রণ: সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের মতে, ৯১ লক্ষ ভুয়া নাম বাদ পড়া মানেই শাসক দলের পেশিশক্তি ও রিগিং-এর ক্ষমতার ওপর বড় আঘাত। প্রকৃত ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারলে বাম ক্যাডার-ভিত্তিক ভোট অনেক আসনে নির্ণায়ক হবে।
পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষোভ: বাদ পড়া ভোটারদের একটি বড় অংশই পরিযায়ী শ্রমিক। তাদের ভোটাধিকার হরণের ইস্যুকে কেন্দ্র করে বামেরা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছে, তাতে গ্রামীণ জনপদে তাদের হারানো জনভিত্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মেরুকরণ বিরোধী বিকল্প: তৃণমূল ও বিজেপির তীব্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে বীতশ্রদ্ধ ভোটাররা স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশের পর পুনরায় বামেদের ‘বিকল্প রাজনীতি’র দিকে ঝুঁকতে পারে। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের মতো তরুণ নেতাদের নেতৃত্বে নতুন ভোটারদের মধ্যেও বামেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।
চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
সিপিআই(এম) নেতা সুজন চক্রবর্তীর মতে, "নির্বাচন কমিশন ভোটারদের ‘আন্ডার ট্রায়াল’ করে রাখলেও এর ফলে তৃণমূলের ভোট-লুঠের পথ বন্ধ হয়েছে।" শাসক দল তৃণমূল যেখানে তাদের ‘সুরক্ষা কবচ’ হারানোর ভয়ে বিচলিত, আর বিজেপি যেখানে একে ‘অনুপ্রবেশকারী হঠাও’ অভিযান বলছে— সেখানে বামপন্থীদের মূল লক্ষ্য এখন একটাই: "ভুয়া ভোটার মুক্ত স্বচ্ছ তালিকা, এবার বিধানসভায় ফেরার পালা।"
আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিলের ব্যালট বক্সই বলে দেবে, এই সংশোধিত তালিকা বামেদের ‘শূন্য’র গেরো কাটিয়ে বিধানসভার অন্দরে ফেরাতে পারে কি না।
তথ্যসূত্র: ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI), ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল এবং ৮ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন।


