এক নজরে:
দুর্গাপুরের গান্ধী মোড় থেকে ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করল সিপিআই(এম)।
রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল এবং কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে একযোগে নিশানা সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদকের।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমবায়ে নির্বাচন বন্ধ এবং কৃষকদের শোচনীয় অবস্থা নিয়ে রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা।
বেকারত্ব ও দুর্নীতির মতো মূল সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতে মেরুকরণের রাজনীতির অভিযোগ।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুর:
চব্বিশের লোকসভা নির্বাচন এখন অতীত। বাংলার রাজনৈতিক মহলের পাখির চোখ এখন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। আর সেই মেগা লড়াইকে সামনে রেখেই শিল্পশহর দুর্গাপুরের প্রাণকেন্দ্র গান্ধী মোড় ময়দান থেকে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের দামামা বাজিয়ে দিল সিপিআই(এম)। রবিবারের এই হাইভোল্টেজ জনসভা থেকে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপিকে একযোগে তীব্র আক্রমণ করেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। রাজ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সমবায়—সর্বত্র নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন, ২০২৬ সালের লড়াই হবে হারানো গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনার লড়াই।
'রাজ্যে এখন আর নির্বাচন হয় না, সবই মনোনীত'
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে মাথায় রেখে এদিনের জনসভায় অতীত ও বর্তমানের এক তুল্যমূল্য চিত্র সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেন সেলিম। বামফ্রন্ট আমলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, > "আগে রাজ্যে স্কুল, কলেজ, বিভিন্ন বোর্ড থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হত। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চালাতেন। কিন্তু এই তৃণমূল রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এবং কেন্দ্রে বিজেপি আসার পর থেকে সেই ব্যবস্থাটাই তুলে দেওয়া হয়েছে।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বর্তমানে কোনও নির্বাচিত সংস্থা নেই; সবই শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীদের দ্বারা মনোনীত। মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে রাজ্যের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে বলে তিনি তোপ দাগেন।
সমবায় নির্বাচনে দুর্নীতি ও পুলিশের অপব্যবহার
গ্রাম ও মফস্বলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা সমবায় সমিতিগুলির বর্তমান বেহাল দশার কথাও উঠে আসে সেলিমের বক্তব্যে। তিনি বলেন, "আজ বাংলায় একটা সাধারণ কো-অপারেটিভ বা সমবায় নির্বাচনও সুষ্ঠুভাবে হতে দেওয়া হচ্ছে না। সেখানেও চরম দুর্নীতি, জুলুমবাজি এবং মস্তানি চলছে।" তাঁর অভিযোগ, পুলিশ প্রশাসনকে শাসকদলের 'দলদাসে' পরিণত করা হয়েছে এবং ভয় দেখিয়ে জোরজবরদস্তি সমবায়গুলি দখল করা হচ্ছে। এই স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের লক্ষ্যেই আগামী নির্বাচনে মানুষকে জোটবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কৃষকদের হাহাকার ও সরকারের উদাসীনতা
বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বাংলার কৃষকদের ইস্যু যে বামেদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে চলেছে, তা এদিনের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার। সেলিম বলেন, "রাজ্যের কৃষকদের অবস্থা আজ অত্যন্ত শোচনীয়। কৃষি সরঞ্জামগুলোর ব্যাপক চাহিদা থাকলেও সেগুলো কৃষকদের হাতে পৌঁছচ্ছে না।" কৃষকদের ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া, সারের অভাব এবং যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের রুটিরুজির প্রশ্নে রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
নজর ঘোরাতে মেরুকরণের রাজনীতি
রাজ্যের আসল সমস্যা—বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং নির্বাচন না হওয়া—থেকে সাধারণ মানুষের নজর ঘোরাতে কীভাবে পড়শি দেশের বিষয় এবং মেরুকরণের রাজনীতিকে ব্যবহার করা হয়, তা নিয়েও তীব্র কটাক্ষ করেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক। তিনি বলেন, "মিডিয়াতে প্রতিদিন শুধু বাংলাদেশের খবর দেখানো হয়। সেখানকার ধর্মস্থান বা সংখ্যালঘুদের ওপর কী হচ্ছে, তা নিয়েই মেতে থাকে একাংশ।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেলিমের এই মন্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল এটা বোঝানো যে, বাংলার বেকার যুবক বা দুর্দশাগ্রস্ত কৃষকের খবরের চেয়ে সুকৌশলে পড়শি দেশের ইস্যু সামনে এনে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করা হচ্ছে, যাতে মানুষ তাঁদের আসল অধিকারের কথা ভুলে যান।
২০২৬-এর রূপরেখা ও কর্মীদের প্রতি বার্তা
গান্ধী মোড় ময়দানের এই জনসভায় সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় বাম শিবিরের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। সভার শেষে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে কড়া বার্তা দিয়ে সেলিম বলেন, "এখন থেকেই বুথে বুথে, গ্রামে গ্রামে এবং কলকারখানায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে।" তৃণমূলের দুর্নীতি এবং বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিই যে একমাত্র বিকল্প, সেই বার্তা দিয়ে বাংলায় ফের মানুষের সরকার প্রতিষ্ঠার ডাক দেন তিনি।







