কলকাতা/কাঠমান্ডু: এভারেস্ট, লোৎসে, মাকালু বা অন্নপূর্ণার মতো বিশ্বের উচ্চতম ও দুর্গম পর্বতশৃঙ্গগুলো জয় করা এমনিতে প্রবল ঝুঁকির কাজ। কিন্তু সেই মৃত্যুকূপের মাঝে যদি রক্ষকেরাই ভক্ষক হয়ে ওঠে? সম্প্রতি নেপালের পর্বতারোহণ জগতে এমনই এক হাড়হিম করা ও চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির কথা ভিডিও বার্তায় ফাঁস করলেন ভারতের প্রখ্যাত পর্বতারোহী পিয়ালী বসাক।
পিয়ালী বসাক, যিনি এভারেস্টসহ পৃথিবীর প্রথম দশটি উচ্চতম শৃঙ্গের মধ্যে ছ'টি সফলভাবে আরোহণ করেছেন এবং বিনা অক্সিজেনেও পর্বতশৃঙ্গ জয় করার বিরল কৃতিত্বের অধিকারী, তিনি নেপালের পর্বতারোহণ এজেন্সির একাংশ এবং শেরপাদের এই ভয়ংকর চক্রান্তের কথা জনসমক্ষে নিয়ে এসেছেন।
কীভাবে চলত এই জালিয়াতি?
পিয়ালী জানান, নেপালে পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে 'হেলি রেসকিউ' বা হেলিকপ্টার উদ্ধারকাজের ইনস্যুরেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। আর এই ইনস্যুরেন্সের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করতেই তৈরি হয়েছিল এক বিশাল চক্র। কিছু অসাধু শেরপা পর্বতারোহীদের খাবার ও জলে ইচ্ছাকৃতভাবে বেকিং সোডা বা অন্য ক্ষতিকারক দ্রব্য মিশিয়ে দিত। এর ফলে আরোহীরা মাঝপথে কৃত্রিমভাবে 'হাই অল্টিটিউড সিকনেস'-এ (উচ্চতাজনিত অসুস্থতা) আক্রান্ত হতেন। আরোহী অসুস্থ হলেই তড়িঘড়ি 'রেসকিউ' বা উদ্ধারের নাম করে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করত ওই অসাধু চক্র। এই জালিয়াতির অভিযোগে সম্প্রতি নেপাল সরকার ২০ জন শেরপাকে গ্রেপ্তার করেছে, যে পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন পিয়ালী।
পিয়ালীর নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা:
শুধু অন্যদের কথাই নয়, ২০১৯ সালের এভারেস্ট অভিযানে নিজের সঙ্গে ঘটা এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি, যা তিনি আগেও তার ইউটিউব চ্যানেলে জানিয়েছিলেন। পিয়ালী জানান, এভারেস্টের চূড়ান্ত শৃঙ্গ (সামিট) থেকে যখন তিনি মাত্র ৪০০ মিটার দূরে, তখন এক অসাধু চক্র তার ওপর হামলা চালায়। তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয় এবং মুখে ঘুষি মারা হয়।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, ওই উচ্চতায় বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল তার 'অক্সিজেন মাস্ক' এবং অন্যান্য জরুরি সরঞ্জাম তার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পিয়ালী অভিযোগ করেন, বেশি টাকার লোভে অসাধু শেরপারা তার সেই মাস্ক এবং স্লিপিং ব্যাগ বিদেশিদের কাছে 'ব্ল্যাকে' বিক্রি করে দেয়। অক্সিজেন সিলিন্ডারেও পর্যাপ্ত অক্সিজেন ছিল না বলে তিনি জানান। ওই উচ্চতায় অক্সিজেন মাস্ক কেড়ে নেওয়ার অর্থ হলো নিশ্চিত মৃত্যু। এত চরম প্রতিকূলতা এবং চক্রান্তের পরেও তিনি নিজের অদম্য মনের জোরে বিনা অক্সিজেনে বেঁচে ফিরে আসেন।
নেপাল সরকারের কাছে অভিযোগ:
পিয়ালী জানান, সুস্থ হয়ে ফিরে তিনি নেপাল সরকারের 'ডিব্রিফিং ফর্মে' (Debriefing Form) লিখিতভাবে এই চক্রান্ত, মারধর এবং খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তবে সেই সময় সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অবশেষে এতদিন পর এই চক্রটি ধরা পড়ায় তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
পিয়ালীর বার্তা:
ভিডিওর শেষে পিয়ালী গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "পাহাড়ের মানুষেরা এবং শেরপারা বরাবরই খুব সৎ হয়ে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে বাইরের মানুষের সংস্পর্শে এসে এবং ব্যবসার খাতিরে তাদের একাংশ বদলে যাচ্ছেন এবং অসৎ উপায় অবলম্বন করছেন।" তিনি চান এই ধরনের জালিয়াতি অবিলম্বে বন্ধ হোক এবং যারা সত্যিকারের পর্বতারোহী, তারা যেন এমন বিপদের মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে সকলকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
নেপাল সরকারের সাম্প্রতিক এই ধরপাকড় পর্বতারোহণ জগতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও পর্বতারোহীরা।