বিশেষ প্রতিবেদন, দুর্গাপুর: এ নেহাতই কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, এ যেন এক নীরব বিপ্লব। প্রখর রোদ আর সমস্ত কাঠিন্যকে উপেক্ষা করে দুর্গাপুরের রাজপথে এদিন নেমে এসেছিল সাধারণ মানুষের ঢল। কারখানার শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রথমবার ভোট দেওয়া তরুণ, কিংবা বয়সের ভারে ন্যুব্জ অশীতিপর বৃদ্ধ— সকলেরই লক্ষ্য ছিল একটাই, নিজের গণতান্ত্রিক অধিকারটুকু সযত্নে প্রয়োগ করা। আর সেই সম্মিলিত আবেগেরই প্রতিফলন ঘটল ইভিএম-এর বোতামে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দুর্গাপুর পূর্ব কেন্দ্রের ভোটদানের হার ছুঁল ৯০.০৭ শতাংশ, যা শুধু এই কেন্দ্রের ইতিহাসেই নয়, গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই এক অভূতপূর্ব মাইলফলক।
শিল্পশহরের এই বিপুল জনজোয়ার প্রমাণ করে দিল, সাধারণ মানুষ আর নীরব দর্শক নেই; নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তারা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং দায়বদ্ধ।
একনজরে গণতন্ত্রের উৎসবের খতিয়ান
| বিভাগ | সংখ্যা |
| মোট নথিভুক্ত ভোটার | ২,৩৭,১২৭ জন |
| মোট ভোট পড়েছে | ২,১৩,৫৯০ টি |
| ভোট দেননি | ২৩,৫৩৭ জন |
| ভোটদানের হার | ৯০.০৭% |
পরিবর্তনের পদধ্বনি নাকি আস্থার সিলমোহর? (বিগত নির্বাচনের তুলনামূলক চিত্র)
গত এক দশকের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, দুর্গাপুর পূর্বের ভোটাররা বরাবরই সচেতন। কিন্তু এবার যেন সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেছে।
| বছর | মোট ভোটার | ভোট পড়েছে | ভোটের হার |
| ২০২৬ | ২,৩৭,১২৭ | ২,১৩,৫৯০ | ৯০.০৭% |
| ২০২১ | ~২,২৫,০০০ | ১,৯২,৮৬৫ | ৮৫.৭% |
| ২০১৬ | ২,৩১,৩১৩ | ১,৯০,৪১৯ | ৮২.৩% |
| ২০১১ | ~২,১০,০০০ | ১,৭২,৯৮৩ | ৮২.৩% |
ইভিএম-এর গর্ভে কোন রাজনৈতিক সমীকরণ?
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় এবার প্রায় ২১,০০০ বেশি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এই অপ্রত্যাশিত জলোচ্ছ্বাসই এখন রাজনৈতিক দলগুলোর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে বিজেপি ২৬,৫৯১ ভোটের একটি বড় লিড পেয়েছিল। কিন্তু বিধানসভার এই বিশাল ভোটদান কি সেই সমীকরণকে অক্ষত রাখবে?
মেহনতি মানুষের লড়াই ও বামপন্থা: দুর্গাপুর মূলত শ্রমজীবী মানুষের শহর। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআইএম প্রার্থী কমরেড সীমান্ত চ্যাটার্জির নিবিড় জনসংযোগ এবং মেহনতি মানুষের রুটি-রুজির লড়াইকে সামনে রেখে করা প্রচার এই বর্ধিত ভোটদানের একটি বড় কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ কি এবার লাল ঝান্ডার বাক্সে নীরব সমর্থন হিসেবে জমা পড়ল?
প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া নাকি রাজ্যের প্রকল্প: অন্যদিকে, বিরোধীদের দাবি, এই বিপুল ভোট আদতে রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ (Anti-incumbency)। তবে তৃণমূল কংগ্রেস মনে করছে, তাদের সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোই সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে মহিলাদের, বুথমুখী করেছে বিপুল সংখ্যায়।
জনতার রায়ের অপেক্ষায় প্রহর গোনা
ভোট শেষ। ইভিএমগুলো এখন কড়া নিরাপত্তায় স্ট্রংরুমে বন্দি। কিন্তু ওই যন্ত্রগুলোর ভেতরে বন্দি হয়ে আছে দুর্গাপুর পূর্বের ২ লক্ষ ১৩ হাজার ৫৯০ জন মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা এবং আগামী দিনের স্বপ্ন। এই বিপুল ভোটদান কোনো নির্দিষ্ট দলের জয় বা পরাজয়ের চেয়েও অনেক বড় একটি বিষয়কে প্রতিষ্ঠিত করল— তা হলো গণতন্ত্রের প্রতি এই শহরের মানুষের অটুট বিশ্বাস।
এখন শুধু গণনার দিনের অপেক্ষা। সেদিন ইভিএম খুললেই জানা যাবে, দুর্গাপুর পূর্বের এই ঐতিহাসিক জনজোয়ার শেষ পর্যন্ত কোন তীরে গিয়ে আছড়ে পড়ল।


