মাদুরাই, ৭ এপ্রিল ২০২৬: তামিলনাড়ুর সাথানকুলামে ২০২০ সালের কুখ্যাত কাস্টোডিয়াল নির্যাতন ও হত্যা মামলায় একটি ল্যান্ডমার্ক রায় দিয়েছে মাদুরাইয়ের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও সেশনস আদালত। বিচারক জি. মুথুকুমারান সোমবার (৬ এপ্রিল) পিতা-পুত্র জয়রাজ ও বেনিক্সের নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়জন পুলিশকর্মীকে মৃত্যুদণ্ডের (ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু) আদেশ দিয়েছেন।
এটি ভারতের বিচারবিভাগীয় ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা, যেখানে একই মামলায় একসঙ্গে নয়জন পুলিশকর্মীকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে। আদালত এই ঘটনাকে ‘রেয়ারেস্ট অফ রেয়ার’ (বিরলতম অপরাধ) বলে অভিহিত করেছেন। রায়ে বলা হয়েছে, পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এই কঠোর দণ্ডই উপযুক্ত।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: সেই ভয়াবহ রাত
২০২০ সালের ১৯ জুন, করোনা লকডাউনের নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে সাথানকুলাম থানার পুলিশ ৫৯ বছর বয়সী দোকানদার পি. জয়রাজকে গ্রেপ্তার করে। তার ছেলে জে. বেনিক্স (৩১) বাবাকে ছাড়ানোর জন্য থানায় গেলে তাকেও আটক করা হয়।
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা ধরে ওই পিতা-পুত্রের ওপর চলে অমানবিক মধ্যযুগীয় নির্যাতন। তদন্তে উঠে আসে যে:
দোকান খোলার সময়সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল।
নির্যাতনের ফলে জয়রাজ ও বেনিক্সের শরীরে যথাক্রমে ১৭ ও ১৩টি গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।
তাদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালানো হয়েছিল এবং নিজ হাতে থানার মেঝের রক্ত পরিষ্কার করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
২২ জুন বেনিক্স এবং ২৩ জুন জয়রাজ কোভিলপট্টি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। একজন মহিলা কনস্টেবলের সাহসী সাক্ষ্য পুলিশের এই পৈশাচিক আচরণের পর্দা ফাঁস করতে সাহায্য করে।
রায়ের মূল পয়েন্টসমূহ
আদালত এই মামলায় অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। রায়ের প্রধান দিকগুলো হলো:
সর্বোচ্চ সাজা: প্রধান আসামি ইন্সপেক্টর এস. শ্রীধরসহ ৯ জন পুলিশকর্মীকেই খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিপুল জরিমানা: ভিকটিমের পরিবারকে (বেনিক্সের মা) মোট ১.৪০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আসামিরা এই টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা আদায় করা হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: বিচারক বলেন, "পুলিশের অহংকার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার দু’জন নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এই রায় পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা।"
এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে ভিকটিমের পরিবার এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো। জয়রাজের পরিবার জানিয়েছে, দীর্ঘ ৬ বছরের অপেক্ষার পর অবশেষে তারা ন্যায়বিচার পেলেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় পরবর্তীকালে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট) চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে। সাধারণত নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড উচ্চ আদালতে বহাল রাখার নজির খুব কম, তবে অপরাধের নৃশংসতা বিবেচনায় এই রায়টি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
২০২০ সালে এই হত্যাকাণ্ডটি ভারতের ‘জর্জ ফ্লয়েড’ ঘটনা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল। আজকের এই রায় ভারতের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করবে বলে মনে করা হচ্ছে।


