শংকর পাল | দুর্গাপুর
ভারতের অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি কারা? শেয়ার বাজারের সূচক, বড় শিল্পগোষ্ঠী বা কর্পোরেট সংস্থাগুলির সাফল্যের আড়ালে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চোখ পড়ে দেশের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের দিকে। খনি, কারখানা, নির্মাণক্ষেত্র, কৃষিজমি, রেললাইন, বন্দর, বাজার, পরিবহণ ব্যবস্থা, হাসপাতাল, হোটেল, এমনকি ডিজিটাল অর্থনীতির ডেলিভারি নেটওয়ার্ক— সর্বত্র শ্রমিকের ঘামেই গড়ে উঠছে ভারতের উন্নয়নের কাঠামো।
তবুও দেশের অধিকাংশ শ্রমিক আজও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, কম মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এবং শ্রমিক অধিকারের সংকোচনের মুখোমুখি। এই বাস্তবতার মধ্যেই ৩০ মে পালিত হচ্ছে সেন্টার অফ ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (সি.আই.টি.ই.উ)-এর ৫৭তম প্রতিষ্ঠা দিবস।
১৯৭০ সালের ৩০ মে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন গত ৫৬ বছরের সংগ্রামী পথচলা অতিক্রম করে আজ ৫৭তম বছরে পদার্পণ করেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ভারতীয় শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে সি.আই.টি.ই.উ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শিল্পাঞ্চল, খনি এলাকা, কৃষিক্ষেত্র থেকে শুরু করে অসংগঠিত শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন ও গণআন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেছে।
ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড: অসংগঠিত শ্রমশক্তি
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল অসংগঠিত ক্ষেত্রের ব্যাপকতা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮২ শতাংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত। সংখ্যার বিচারে এই শ্রমশক্তি প্রায় ৪৪ কোটি।
এই শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছেন কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, হকার, গৃহকর্মী, পরিবহণ কর্মী, ইটভাটা শ্রমিক, মৎস্যজীবী, ক্ষুদ্র শিল্পের কর্মী, চা বাগানের শ্রমিক, ঠিকা শ্রমিক, সাফাইকর্মী এবং ক্রমবর্ধমান সংখ্যক অ্যাপভিত্তিক গিগ ওয়ার্কার।
ভারতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং দেশের জিডিপির একটি বড় অংশ এই শ্রমিকদের অবদানের উপর নির্ভরশীল। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের কাজের কোনও স্থায়িত্ব নেই। নেই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, অবসরকালীন ভাতা বা দুর্ঘটনা বিমার নিশ্চয়তা।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বনাম শ্রমিকের বাস্তবতা
গত এক দশকে ভারত বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্র সরকার উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির নানা পরিসংখ্যান তুলে ধরছে। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলির প্রশ্ন— এই প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের কাছে?
মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং ক্রমবর্ধমান চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ শ্রমজীবী মানুষের জীবনে নতুন চাপ তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই স্থায়ী চাকরির পরিবর্তে আউটসোর্সিং এবং কন্ট্রাক্ট সিস্টেমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সি.আই.টি.ই.উ-এর মতে, উৎপাদনশীলতা বাড়লেও শ্রমিকদের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হচ্ছে।
eShram: তথ্যভাণ্ডার নাকি সমাধানের সূচনা?
অসংগঠিত শ্রমিকদের নথিভুক্ত করার লক্ষ্যে কেন্দ্র সরকার eShram পোর্টাল চালু করে। ইতিমধ্যে ৩০ কোটিরও বেশি শ্রমিক এই পোর্টালে নিবন্ধিত হয়েছেন।
এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কারণ প্রথমবারের মতো দেশের অসংগঠিত শ্রমশক্তির একটি বিস্তৃত তথ্যভাণ্ডার তৈরি হয়েছে। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলির মতে, শুধুমাত্র তথ্য সংগ্রহ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রশ্ন হল, এই নিবন্ধিত শ্রমিকরা কতটা সামাজিক নিরাপত্তা পাচ্ছেন? কতজন স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন বা দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণের সুবিধা পাচ্ছেন? কতজনের কর্মসংস্থান স্থিতিশীল হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
খনি ও শিল্পাঞ্চলের বাস্তবতা
দুর্গাপুর, আসানসোল, রানিগঞ্জ, ঝাড়িয়া, সিঙ্গরৌলি বা তালচেরের মতো শিল্প ও কয়লাখনি অঞ্চলে কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন এখনও নানা সমস্যায় জর্জরিত।
বিশেষ করে ঠিকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাব একটি বড় সমস্যা। একই কর্মক্ষেত্রে কাজ করেও স্থায়ী ও ঠিকা শ্রমিকদের মধ্যে বেতন এবং সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।
কয়লা, ইস্পাত, বিদ্যুৎ ও নির্মাণ শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধির চাপ বাড়লেও শ্রমিক নিরাপত্তা এবং কল্যাণের প্রশ্নে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
কৃষি শ্রমিকদের সংকট
ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে কৃষি শ্রমিকদের উপর। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান মৌসুমি এবং অনিশ্চিত।
খরা, বন্যা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃষি উৎপাদনের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলছে কৃষি শ্রমিকদের জীবনে। অনেক ক্ষেত্রেই কাজের সন্ধানে তাঁদের শহরমুখী হতে হচ্ছে।
ফলে গ্রাম থেকে শহরে শ্রম অভিবাসনের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে।
গিগ অর্থনীতি: নতুন যুগের শ্রমিক, পুরনো সমস্যা
ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের শ্রমবাজার তৈরি হয়েছে। খাদ্য সরবরাহ, ই-কমার্স ডেলিভারি, ক্যাব পরিষেবা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ তরুণ আজ গিগ অর্থনীতির অংশ।
কিন্তু তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিক হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পান না। ফলে অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, কর্মহীনতা বা বার্ধক্যের সময় তাঁদের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।
সি.আই.টি.ই.উ-সহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এই শ্রমিকদের পূর্ণ শ্রমিক মর্যাদা, ন্যূনতম মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
কেন এখনও প্রাসঙ্গিক সি.আই.টি.ই.উ?
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সি.আই.টি.ই.উ শ্রমিক আন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্বে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। মজুরি বৃদ্ধি, শ্রমিক নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শ্রম আইন রক্ষার দাবিতে সংগঠনটি বহু আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে।
বর্তমানে সংগঠনটির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ—
- চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিস্তার
- রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বেসরকারিকরণ
- শ্রম আইন ও শ্রমিক সুরক্ষার প্রশ্ন
- বেকারত্ব বৃদ্ধি
- গিগ ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক শ্রমিকদের অধিকার
- মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি নিশ্চিত করা
- সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা
শ্রমিক সংগঠনগুলির মতে, শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রসার সম্ভব নয় এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নও টেকসই হতে পারে না।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপট
পশ্চিমবঙ্গে শিল্পাঞ্চল, চা বাগান, কৃষিক্ষেত্র, পরিবহণ এবং নির্মাণ শিল্পে বিপুল সংখ্যক অসংগঠিত শ্রমিক কাজ করেন। eShram পোর্টালে রাজ্যের কয়েক কোটি শ্রমিক নিবন্ধিত হয়েছেন।
কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা এখনও শ্রমজীবী মানুষের প্রধান উদ্বেগ।
শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, শ্রমিক কল্যাণ প্রকল্পগুলির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি।
৫৭ বছরে নতুন অঙ্গীকার
সি.আই.টি.ই.উ-এর ৫৭তম প্রতিষ্ঠা দিবস শুধু একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি শ্রমিক আন্দোলনের দীর্ঘ সংগ্রামী ঐতিহ্যের স্মারক।
দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল ভিত্তি শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের দাবি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
৫৭তম প্রতিষ্ঠা দিবসে তাই আবারও উচ্চারিত হচ্ছে শ্রমিক আন্দোলনের চিরন্তন বার্তা—
“শ্রমিকের শ্রমেই সৃষ্টি হয় সমাজের সম্পদ; তাই সেই সম্পদের উপর শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।”


