ভিউজ নাউ ডেস্ক | ৩০ মে ২০২৬
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি কয়লা শিল্প। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে ইস্পাত, সিমেন্ট এবং ভারী শিল্পের চাকা সচল রাখতে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টন কয়লা উত্তোলন করা হয় দেশের বিভিন্ন খনি থেকে। কিন্তু এই উৎপাদনের নেপথ্যে থাকা বিপুল সংখ্যক ঠিকা শ্রমিকের জীবন আজও অনিশ্চয়তা, কম মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ঘেরা।
সি.আই.টি.ইউ-এর ৫৬তম প্রতিষ্ঠা দিবসে দেশের কয়লা শিল্পের এই ঠিকা শ্রমিকদের দুর্দশার প্রশ্ন আবারও সামনে উঠে এসেছে। শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, কয়লা উৎপাদনের বড় অংশের দায়িত্ব বহন করলেও লক্ষাধিক ঠিকা শ্রমিক এখনও স্থায়ী কর্মীদের তুলনায় বহু ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার।
স্থায়ী শ্রমিক কমছে, বাড়ছে ঠিকা শ্রমিক নির্ভরতা
কোল ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল সংস্থার স্থায়ী শ্রমিক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ২০ হাজার ২৪২ জন। এক বছরের ব্যবধানে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা কমেছে ৮,৬১৯ জন।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কোল ইন্ডিয়ার অধীনে নিবন্ধিত ঠিকা শ্রমিকের সংখ্যা ১ লক্ষ ৬ হাজার ৩২৪ জন। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, বাস্তবে কয়লা শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ লক্ষ ঠিকা শ্রমিক কাজ করেন।
শ্রমিক নেতাদের মতে, গত দুই দশকে উৎপাদন বাড়লেও স্থায়ী নিয়োগের বদলে ক্রমশ ঠিকাদারি ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা কমেছে এবং শ্রম আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে।
উৎপাদনের বড় অংশই ঠিকা শ্রমিকদের কাঁধে
শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, কোল ইন্ডিয়ার মোট উৎপাদনের প্রায় ৬৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ঠিকা শ্রমিকদের ভূমিকা রয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে দেশের মোট কয়লা উৎপাদন ১০৪৭ মিলিয়ন টন অতিক্রম করেছে, যা একটি নতুন রেকর্ড। একই সময়ে কোল ইন্ডিয়ার উৎপাদন শত শত মিলিয়ন টনের ঘরে পৌঁছেছে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সংস্থার মুনাফাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলির প্রশ্ন, উৎপাদন ও মুনাফা বাড়লেও সেই সুফল কি শ্রমিকদের কাছে পৌঁছচ্ছে?
এক দশক মজুরি বৃদ্ধি ছাড়াই কাজ
কয়লা শিল্পের ঠিকা শ্রমিকদের অন্যতম বড় অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিন মজুরি সংশোধন না হওয়া। ২০১৩ সালের পর প্রায় দশ বছর ধরে বহু ক্ষেত্রে দৈনিক মজুরি কার্যত স্থির ছিল।
দীর্ঘ আন্দোলন ও আলোচনার পর ২০২৩-২৬ সময়কালের বেতন চুক্তিতে দৈনিক মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়। শ্রমিক সংগঠনগুলির মতে, এই সাফল্যের পিছনে দীর্ঘদিনের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলির চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষায় বড় ঘাটতি
ঠিকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এখনও নানা সমস্যা রয়ে গেছে বলে অভিযোগ।
শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি—
- বহু ক্ষেত্রে PF এবং ESI নিয়মিত জমা হয় না।
- হাজিরা রেকর্ড ও শ্রমিক নথিভুক্তিকরণে অনিয়ম রয়েছে।
- খনি নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ হয় না।
- সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য শ্রমিক অধিকার কার্যকরভাবে মানা হয় না।
- ঠিকাদারের চুক্তি শেষ হলে শ্রমিকদের চাকরিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, নিবন্ধিত ঠিকা শ্রমিকদের বড় অংশ এখনও পূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আসেননি।
পূর্বাঞ্চলীয় কয়লাক্ষেত্রে উদ্বেগ
পূর্বাঞ্চলীয় কয়লাক্ষেত্র বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত ইসিএল এলাকায় কয়েক হাজার স্থায়ী ও ঠিকা শ্রমিক কাজ করেন।
আসানসোল-রানিগঞ্জ কয়লাক্ষেত্র দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কয়লা উৎপাদন কেন্দ্র। এখানে শ্রমিক সংগঠনগুলি বারবার দাবি তুলেছে যে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তাও বাড়াতে হবে।
প্রতিষ্ঠা দিবসে সি.আই.টি.ইউ-এর বার্তা
১৯৭০ সালের ৩০ মে প্রতিষ্ঠিত সি.আই.টি.ইউ গত ৫৬ বছর ধরে দেশের সংগঠিত ও অসংগঠিত শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে সক্রিয়।
প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে সংগঠনের নেতারা বলেছেন, কয়লা শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধির প্রকৃত নায়ক শ্রমিকরাই। তাই ঠিকা শ্রমিকদের HPC মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং স্থায়ীকরণের দাবিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তাঁদের বক্তব্য, "দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্পের চাকা ঘোরানো শ্রমিকদের জীবন যদি অনিশ্চিত থাকে, তবে উন্নয়নের দাবিও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।"
৫৬তম প্রতিষ্ঠা দিবসে তাই শুধু অতীতের সংগ্রামের স্মরণ নয়, কয়লা শিল্পের লক্ষাধিক ঠিকা শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বানই উঠে এসেছে বিভিন্ন শ্রমিক সমাবেশ থেকে।


