ভিউজ নাও ডেস্ক:
দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে পলাতক থাকার পর অবশেষে বিধাননগর পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জের অপসারিত ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার (বিডিও) প্রশান্ত বর্মণ। সোমবার গভীর রাতে নিউটাউনের ইকো পার্ক সংলগ্ন এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, রাস্তার ধারে মদ্যপ অবস্থায় ফুটপাথে পড়ে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। এরপরই তাঁকে ইকো পার্ক থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং মঙ্গলবার সকালে মোটর ভেহিকলস আইনের আওতায় আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তবে এই ঘটনাকে শুধুমাত্র “মদ্যপ অবস্থায় ধরা পড়া” হিসেবে দেখছে না রাজনৈতিক মহল কিংবা তদন্তকারীদের একাংশ। কারণ, প্রশান্ত বর্মণের নাম বহুদিন ধরেই জড়িয়ে রয়েছে সল্টলেক–নিউটাউনের বহুচর্চিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে। তাঁর গ্রেপ্তারি সেই মামলার তদন্তে নতুন মোড় এনে দিতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুন: কী ঘটেছিল?
২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর দত্তাবাদের নিজের সোনার দোকান থেকে আচমকাই নিখোঁজ হয়ে যান স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা। পরিবারের অভিযোগ ছিল, তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন নিউটাউনের যাত্রাগাছি খালপাড় থেকে উদ্ধার হয় তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহ। ময়নাতদন্তে স্পষ্ট হয়, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে খুন করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, নীলবাতি লাগানো একটি সরকারি গাড়িতে করে স্বপন কামিল্যাকে নিউটাউনের একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, সেই গাড়িটি ব্যবহার করা হচ্ছিল বিডিও প্রশান্ত বর্মণের প্রভাব খাটিয়ে। ওই ফ্ল্যাটেই তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয় এবং পরে তাঁর মৃত্যু হলে দেহ খালের ধারে ফেলে দেওয়া হয়।
কেন বিতর্কের কেন্দ্রে প্রশান্ত বর্মণ?
মৃত স্বর্ণ ব্যবসায়ীর পরিবারের অভিযোগ, পুরো অপহরণ ও খুনের ঘটনার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন প্রশান্ত বর্মণ। কিন্তু তদন্ত এগোলেও আশ্চর্যজনকভাবে প্রথম দফার চার্জশিটে তাঁর নাম সরাসরি অভিযুক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বরং তাঁকে “পলাতক” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই নিয়েই শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, প্রশাসনের উচ্চস্তরের যোগসূত্র থাকার কারণেই তাঁকে আড়াল করার চেষ্টা চলছে।
পুলিশ ইতিমধ্যেই এই মামলায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন গাড়িচালক রাজু ঢালি, ঠিকাদার তুফান থাপা-সহ আরও কয়েকজন। তদন্তে দাবি করা হয়েছে, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে স্বপন কামিল্যাকে অপহরণ করা হয়েছিল এবং পুরো ঘটনায় একটি সংগঠিত চক্র কাজ করছিল।
আদালতের নির্দেশও মানেননি বিডিও
প্রশান্ত বর্মণকে নিয়ে আইনি নাটকও কম হয়নি। প্রথম দিকে কলকাতা হাইকোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপে স্থগিতাদেশ দিলেও পরে আদালত তাঁকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। বিচারপতি রাগীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, তাঁকে তদন্তের মুখোমুখি হতেই হবে। পরে সুপ্রিম কোর্টও নির্দেশ দেয়, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। কিন্তু সেই নির্দেশও তিনি অমান্য করেন।
এরপর বিধাননগর আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। অভিযোগ ওঠে, আদালতের নির্দেশ অমান্য করেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিউটাউন–সল্টলেক এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে গ্রেপ্তার এড়িয়ে যাচ্ছিলেন।
নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার
অবশেষে সোমবার গভীর রাতে নিউটাউনের ইকো পার্ক এলাকার ফুটপাথ থেকে তাঁকে আটক করে বিধাননগর পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, প্রথমে সাধারণ মদ্যপ অবস্থার অভিযোগে তাঁকে আটক করা হলেও পরে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হতেই পুরনো মামলার নথি খতিয়ে দেখা শুরু হয়।
এখন পুলিশ বারাসত আদালতে আবেদন জানিয়ে স্বপন কামিল্যা খুন মামলায় তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তদন্তকারীদের মতে, প্রশান্ত বর্মণকে জেরা করা গেলে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক প্রভাবের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
বিরোধীদের চাপ বাড়ছে
এই গ্রেপ্তারের পরই রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। বিরোধী দলগুলির দাবি, শুধুমাত্র কয়েকজন নিম্নস্তরের অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করলেই চলবে না, পুরো প্রশাসনিক–রাজনৈতিক চক্রকে চিহ্নিত করতে হবে। তাঁদের অভিযোগ, এই মামলায় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া না থাকলে একজন অভিযুক্ত সরকারি আধিকারিক এতদিন পলাতক থাকতে পারতেন না।
মানবাধিকার কর্মী এবং নাগরিক সমাজের একাংশও প্রশ্ন তুলেছে—একজন সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তদন্ত এত দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হল? কেন তাঁকে এতদিন গ্রেপ্তার করা গেল না? এবং চার্জশিটে তাঁর নাম সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হল না কেন?
তদন্তে নতুন মোড়?
প্রশান্ত বর্মণের গ্রেপ্তারির ফলে স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন গতি আসতে পারে বলে মনে করছে তদন্তকারী মহল। ইতিমধ্যেই ফরেন্সিক রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ধৃতদের জবানবন্দির ভিত্তিতে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। তদন্তকারীদের একাংশের মতে, এই মামলার সঙ্গে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, বড়সড় আর্থিক ও প্রভাবশালী চক্রের যোগও থাকতে পারে।
এখন নজর আদালত ও পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ, এই মামলার তদন্ত কোন দিকে এগোয়, তার উপর নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত অপরাধকাণ্ডের ভবিষ্যৎ।


