কলকাতা, ১৪ মে ২০২৬:
টানা তিন দিন নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর তলবে সাড়া দিলেন কলকাতা পুলিশের ডিসিপি শান্তনু সিনহা বিশ্বাস। আজ সকালে সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডি দফতরে সশরীরে হাজিরা দেন তিনি। কুখ্যাত সিন্ডিকেট ডন বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে 'সোনা পাপ্পু' সংক্রান্ত আর্থিক তছরুপ এবং বেআইনি লেনদেনের মামলায় তাঁকে এই মুহূর্তে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করছেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী আধিকারিকরা। তাঁর বয়ান থেকে কী তথ্য উঠে আসবে, তা নিয়ে রীতিমতো উত্তেজনা ছড়িয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভরা মরশুমে এই ঘটনা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে ঘি ঢেলেছে। শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে শুরু হয়েছে চরম রাজনৈতিক তরজা।
নির্বাচনী আবহে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা: সরব মুখ্যমন্ত্রী
ডিসিপি শান্তনু বিশ্বাসের বাড়িতে ইডি হানা এবং তাঁকে তলব করা নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হুগলির তারকেশ্বরে একটি মেগা নির্বাচনী জনসভা থেকে কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই অতিসক্রিয়তাকে 'রাজনৈতিক প্রতিহিংসা' বলে তীব্র আক্রমণ করেন তিনি।
মঞ্চ থেকে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন:
"আমার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়েছে। ওরা ভেবেছে এজেন্সি দিয়ে আমাদের ভয় দেখাবে! প্রতিদিন আমাদের ওপর রেইড চালানো হচ্ছে। নির্বাচন এলেই এদের এই নাটক শুরু হয়ে যায়।"
বিজেপি-র বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ:
অন্যদিকে, ডিসিপি শান্তনু বিশ্বাসের ছেলের তরফ থেকে সরাসরি আঙুল তোলা হয়েছে বিরোধী দলনেতা তথা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর দিকে। তাঁর দাবি, এই সম্পূর্ণ ইডি অভিযানটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এটি শুভেন্দু অধিকারীর অঙ্গুলিহেলনেই পরিচালিত হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের অভিযোগ, ২০২৬ সালের নির্বাচনে ফায়দা লুটতে এবং তৃণমূল ঘনিষ্ঠ আধিকারিক ও প্রার্থীদের হেনস্থা করতেই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, মাত্র কয়েকদিন আগেই তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস কুমারের বাড়িতেও আয়কর (IT) হানা হয়েছিল।
কে এই 'সোনা পাপ্পু'? কেন তাকে নিয়ে এত বিতর্ক?
এই গোটা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে 'সোনা পাপ্পু'। দক্ষিণ কলকাতার কসবা এবং বালিগঞ্জ এলাকায় এই কুখ্যাত গ্যাংস্টারের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।
অপরাধের খতিয়ান: তার বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধি (IPC) এবং অস্ত্র আইনের অধীনে দাঙ্গা বাঁধানো, খুনের চেষ্টা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র-সহ একাধিক চাঞ্চল্যকর এফআইআর (FIR) দায়ের করা আছে।
উদ্ধার হওয়া অস্ত্র: ইডি আধিকারিকরা সোনা পাপ্পুর ফার্ন রোডের বিলাসবহুল বাসভবনে তল্লাশি চালিয়ে একটি "Made in USA" (আমেরিকায় তৈরি) রিভলভার উদ্ধার করেছেন, যা তদন্তকারীদের চমকে দিয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আস্ফালন: বর্তমানে সে পলাতক হলেও, পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে মাঝেমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় 'লাইভ' হয়ে ইডি-র বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে। তার অভিযোগ, ইডি তার পরিবারকে অকারণে 'হেনস্থা' করছে।
কীভাবে কাজ করত এই অন্ধকার সিন্ডিকেট?
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, সোনা পাপ্পুর এই বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য এবং মানি লন্ডারিং নেটওয়ার্ক মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপে কাজ করত:
নির্মম তোলাবাজি: দক্ষিণ কলকাতার বড় বড় নির্মাণকারী সংস্থা এবং রিয়েল এস্টেট প্রোমোটারদের টার্গেট করে কোটি কোটি টাকা তোলা আদায় করত এই সিন্ডিকেট।
বেআইনি জমি দখল: সোনা পাপ্পুর নিয়ন্ত্রণাধীন একাধিক ভুঁইফোঁড় সংস্থার মাধ্যমে শহরের বুকে অবৈধভাবে জমি দখল এবং বেআইনি বহুতল নির্মাণের রমরমা কারবার চলত।
মানি লন্ডারিং ও কালো টাকার বিনিয়োগ: তোলাবাজি এবং জমি দখলের মাধ্যমে আসা বিপুল কালো টাকা হাওলার মাধ্যমে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী এবং পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকদের পকেটে পৌঁছত।
তদন্তের জাল ও হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারি
এই মামলার জাল ইতিমধ্যেই অনেক দূর ছড়িয়েছে। পুলিশ, ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদের এক অশুভ আঁতাতের ইঙ্গিত পাচ্ছে ইডি।
জয় কামদার গ্রেফতার: এই চক্রের মূল ফিনান্সিয়াল লিঙ্ক বা 'ফাইন্যান্সিয়ার' হিসেবে গত ১৮ এপ্রিল ইডি-র হাতে গ্রেফতার হন 'সান এন্টারপ্রাইজ'-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর জয় (জয়) কামদার। অভিযোগ, সিন্ডিকেটের কালো টাকা আইনি ব্যবসার মাধ্যমে সাদা করার মূল কারিগর ছিলেন তিনিই।
পুলিশের যোগসাজশ: ডিসিপি শান্তনু সিনহা বিশ্বাস ছাড়াও এই মামলায় ইডি-র স্ক্যানারে রয়েছেন হাওড়ার জয়েন্ট কমিশনার গৌরব লাল। তাঁকেও ইতিমধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে।
তদন্তের টাইমলাইন একনজরে
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের দায়ের করা একাধিক এফআইআর-এর ভিত্তিতে প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট (PMLA)-এর অধীনে তদন্ত শুরু করে ইডি। নিচে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলি দেওয়া হলো:
| তারিখ | ইডি-র পদক্ষেপ ও ঘটনাক্রম |
| ১ এপ্রিল, ২০২৬ | কলকাতা জুড়ে ৮টি ঠিকানায় মেগা তল্লাশি। ১.৪৭ কোটি টাকা নগদ, এবং প্রায় ৬৭.৬৪ লক্ষ টাকার সোনা-রুপো, একাধিক ডিজিটাল ডিভাইস ও নথিপত্র বাজেয়াপ্ত। |
| ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ | ডিসিপি শান্তনু সিনহা বিশ্বাস এবং ব্যবসায়ী জয় কামদারের বাড়িতে যুগপৎ তল্লাশি। আর্থিক তছরুপের অভিযোগে জয় কামদার গ্রেফতার। |
| ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ | আর্থিক লেনদেনের মূল শিকড় খুঁজতে আনন্দপুর এবং আলিপুরের একাধিক নামী ব্যবসায়ীর ঠিকানায় ইডি হানা। |
| মে মাসের শুরু, ২০২৬ | গা ঢাকা দেওয়ায় ডিসিপি শান্তনু বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিশ (Lookout notice) জারি করে কেন্দ্রীয় সংস্থা। |
| ১৪ মে, ২০২৬ | সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে সিজিও কমপ্লেক্সে ইডি-র মুখোমুখি ডিসিপি শান্তনু বিশ্বাস। |
তদন্তের জাল যত এগোচ্ছে, ততই তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক হেভিওয়েট নেতার নাম এই মামলায় জড়িয়ে পড়ার জল্পনা তৈরি হচ্ছে। ইডি সূত্রে খবর, খুব শীঘ্রই বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হতে পারে। একদিকে ২০২৬ সালের হাই-ভোল্টেজ নির্বাচন, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই সাঁড়াশি আক্রমণ— সব মিলিয়ে বাংলার রাজ্য রাজনীতি এখন ফুটন্ত কড়াইয়ের আকার ধারণ করেছে।


