নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুর: আজ ১৪ই মে। বিশ্বচলচ্চিত্রের অন্যতম পথিকৃৎ এবং ভারতীয় সমান্তরাল সিনেমার স্থপতি মৃণাল সেনের ১০৩তম জন্মদিবস। ১৯২৩ সালের এই দিনে তৎকালীন ফরিদপুরে (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কেবল একজন চলচ্চিত্রকার ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সমাজ ও রাজনীতির এক নির্ভীক ভাষ্যকার। আজ তাঁর জন্মলগ্নে দাঁড়িয়ে সমকালীন চলচ্চিত্র এবং সমাজের ওপর তাঁর প্রভাব আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ও সমাজভাবনা
মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র মানেই ছিল প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ। তাঁর ছবিতে উঠে আসত মধ্যবিত্তের দোদুল্যমানতা, শ্রেণি সংঘাত এবং চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা। তাঁর বিখ্যাত 'ক্যালকাটা ট্রিলজি' (ইন্টারভিউ, ক্যালকাটা ৭১ এবং পদাতিক) সত্তরের দশকের উত্তাল কলকাতার এক জীবন্ত দলিল। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ তুঙ্গে, তখন মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র আমাদের নতুন করে আত্মবিশ্লেষণ করতে শেখায়।
সত্যজিৎ-ঋত্বিক ও মৃণাল: তিন স্তম্ভের রসায়ন
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের 'ত্রিমূর্তি' হিসেবে পরিচিত সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেন প্রত্যেকেই ছিলেন স্বকীয় মহিমায় উজ্জ্বল। তবে মৃণাল সেনের বিশেষত্ব ছিল তাঁর পরীক্ষারীক্ষা এবং সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থান।
| পরিচালক | শৈলী | রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি | ভাষার বৈচিত্র্য |
| মৃণাল সেন | ফরাসি নিউ ওয়েভ দ্বারা প্রভাবিত, নিরীক্ষাধর্মী | মার্ক্সবাদী ও সরাসরি প্রতিবাদী | বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া, তেলুগু |
| সত্যজিৎ রায় | ধ্রুপদী বর্ণনাশৈলী, মানবতাবাদ | সূক্ষ্ম ও মানবিক | মূলত বাংলা |
| ঋত্বিক ঘটক | আবেগঘন ও মহাকাব্যিক | দেশভাগ ও শিকড়চ্যুত হওয়ার বেদনা | বাংলা |
ভারতীয় চলচ্চিত্রের মোড় পরিবর্তন: 'ভুবন সোম'
১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'ভুবন সোম' চলচ্চিত্রটি ভারতীয় সিনেমায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। এই ছবির মাধ্যমেই 'ইন্ডিয়ান নিউ ওয়েভ' বা নতুন ধারার সিনেমার জন্ম হয়। সমকালীন সময়ে শ্যাম বেনেগাল বা গোবিন্দ নিহালানির মতো পরিচালকরা যে বাস্তবধর্মী কাজের ধারা বজায় রেখেছিলেন, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন মৃণাল সেন নিজেই।
আজকের চলচ্চিত্রে মৃণাল সেনের ছায়া
বর্তমান সময়ে যখন সিনেমা কেবল বিনোদনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে মৃণাল সেনের 'আকালের সন্ধানে' বা 'খারিজ'-এর মতো ছবিগুলো মনে করিয়ে দেয় যে শিল্পের সামাজিক দায়বদ্ধতা কতখানি। মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি এবং প্রান্তিক মানুষের হাহাকার যেভাবে তিনি রূপালি পর্দায় ফুটিয়ে তুলতেন, তা আজও তরুণ নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করে।
"আমি কোনোদিন ছবি বানাতে চাইনি যদি না সেই ছবির মাধ্যমে কোনো সত্যকে তুলে ধরা যায়।" — মৃণাল সেনের এই আদর্শই ছিল তাঁর কাজের মূল চালিকাশক্তি।
মৃণাল সেনের প্রয়াণ ঘটলেও তাঁর সৃষ্টি আজও সজীব। আজকের ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে যখন আমরা কনটেন্ট বা তথ্যের জোয়ারে ভাসছি, তখন তাঁর লেন্সের সেই নির্ভীক সত্য আজও আমাদের সমাজের দর্পণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান দাদাসাহেব ফালকে জয়ী এই কিংবদন্তিকে তাঁর জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।


