নিজস্ব প্রতিনিধি, চান্দৌলি: উত্তরপ্রদেশের চান্দৌলি জেলায় মাত্র ২৬ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি নৃশংস খুনের ঘটনায় যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তার অবসান ঘটল পুলিশের এনকাউন্টারে। মঙ্গলবার ভোরে পুলিশের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে মৃত্যু হয়েছে অভিযুক্ত সিরিয়াল কিলার গুরপ্রীত সিংয়ের। বছর ৪৫-এর গুরপ্রীত ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কর্মী এবং পাঞ্জাবের তরণ তারণ জেলার বাসিন্দা ছিলেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর গুরপ্রীত গত ২৯ এপ্রিল বিহারের আরা জেলায় একটি নিরাপত্তারক্ষীর কাজে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মদ্যপানের আসক্তির কারণে তাকে কাজ থেকে ছাঁটাই করা হয়। এই ক্ষোভ থেকেই তিনি উন্মাদের মতো আচরণ শুরু করেন এবং কোনো পূর্ব শত্রুতা ছাড়াই সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকেন।
২৬ ঘণ্টার সেই ভয়ঙ্কর তিনটি খুন
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, গুরপ্রীতের প্রতিটি খুনের ধরণ ছিল একই রকম— তিনি সরাসরি নিশানার ‘টেম্পল’ বা কপালে গুলি করতেন।
১. প্রথম খুন (১০ মে, সকাল): দীন দয়াল উপাধ্যায় (DDU)-তাড়িঘাট প্যাসেঞ্জার ট্রেনে গাজিপুরের বাসিন্দা মাংরু চৌধুরীকে (৩৫) গুলি করে হত্যা করেন গুরপ্রীত। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সামান্য তর্কাতর্কির জেরে তিনি পকেট থেকে রিভলভার বের করে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি চালান।
২. দ্বিতীয় খুন (১১ মে, রাত ২টো): জম্মু তাওয়ি এক্সপ্রেসের S-2 কোচের ভেতরে ঘুমন্ত অবস্থায় দিনেশ শাহ (৪২) নামে এক যাত্রীকে গুলি করেন তিনি। এরপর ট্রেন যখন বারাণসীর কাছে ধীরগতিতে চলছিল, তখন তিনি লাফিয়ে পালিয়ে যান।
৩. তৃতীয় খুন (১১ মে, সকাল ৮:৩০): পালিয়ে এসে গুরপ্রীত চান্দৌলির কমলপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর ছদ্মবেশে প্রবেশ করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন লক্ষ্মীনা দেবী (৫৫) নামে এক বৃদ্ধার মাথায় গুলি করে তাকে খুন করেন তিনি।
গ্রেফতার ও এনকাউন্টার
হাসপাতালে খুনের পর পালানোর সময় স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে ধরে ফেলে এবং পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ তার কাছ থেকে একটি রিভলভার, একটি মডিফাইড ডাবল ব্যারেল গান এবং প্রচুর কার্তুজ উদ্ধার করে।
মঙ্গলবার (১২ মে) ভোরে পুলিশ তাকে নিয়ে অপরাধের পুনর্নির্মাণের (Crime Scene Re-creation) জন্য সাকলডিহা এলাকার দরিয়াপুর গ্রামে যায়। অভিযোগ উঠেছে, সেখানে তিনি এক পুলিশ আধিকারিকের পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। পালটা গুলিতে গুরুতর আহত হন গুরপ্রীত। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
পুলিশের বক্তব্য
চান্দৌলির এসপি আকাশ প্যাটেল জানিয়েছেন, "অভিযুক্ত ব্যক্তি মানসিকভাবে কিছুটা বিকারগ্রস্ত ছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই এই সাধারণ মানুষগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন। এনকাউন্টারে আমাদের দুজন পুলিশ কর্মীও সামান্য আহত হয়েছেন।"
পাঞ্জাব থেকে আসা গুরপ্রীতের আত্মীয়দের হাতে ময়নাতদন্তের পর তার মৃতদেহ তুলে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় গোটা এলাকায় যেমন স্বস্তি ফিরেছে, তেমনি একজন প্রাক্তন সেনাকর্মীর এমন বিধ্বংসী রূপ নিয়ে শুরু হয়েছে গভীর চর্চা।


