কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবীর পোশাকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সওয়াল করা নিয়ে গুরুতর আইনি প্রশ্ন তুলল বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (BCI)। এই বিষয়ে আগামী দু'দিনের মধ্যে (১৬ মে, ২০২৬-এর মধ্যে) পশ্চিমবঙ্গ বার কাউন্সিলের কাছে মমতার এনরোলমেন্ট (enrolment) এবং প্র্যাকটিস সংক্রান্ত সমস্ত বিস্তারিত তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রেক্ষাপট: আদালতে মমতার উপস্থিতি
গত ১৩ মে, ২০২৬ তারিখে তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলার (PIL) শুনানিতে অংশ নিতে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবীর পোশাকে উপস্থিত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর তৃণমূল কর্মীদের ওপর এবং দলীয় কার্যালয়ে ব্যাপক ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগ তুলে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল।
আদালতের কাছে সওয়াল করার অনুমতি চেয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জানান, তিনি ১৯৮৫ সালে বার কাউন্সিলে নিজের নাম নথিভুক্ত করেছিলেন। সওয়াল চলাকালীন তাঁর অভিযোগ ছিল— তফসিলি জাতি ও সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলা হয়েছে, ভোট-পরবর্তী হিংসায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং "বাড়ি ও অফিস লুট করা হচ্ছে"।
বিসিআই-এর মূল প্রশ্ন ও নির্দেশিকা
১৪ মে, ২০২৬ তারিখে ইস্যু করা একটি চিঠিতে বিসিআই (BCI) পশ্চিমবঙ্গ বার কাউন্সিলকে নিম্নলিখিত তথ্যগুলি যাচাই করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে:
এনরোলমেন্টের তথ্য: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এনরোলমেন্ট নম্বর এবং রাজ্য বার কাউন্সিলে নাম নথিভুক্ত করার সঠিক তারিখ।
বর্তমান স্ট্যাটাস: রাজ্যের আইনজীবীদের তালিকায় (State Roll of Advocates) তাঁর নাম বর্তমানে বহাল আছে কি না।
স্থগিতাদেশের তথ্য: মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন (২০১১-২০২৬) তিনি স্বেচ্ছায় আইনি প্র্যাকটিস স্থগিত রাখার (voluntary suspension) কোনো আনুষ্ঠানিক সূচনা দিয়েছিলেন কি না।
প্র্যাকটিস চালুর আবেদন: পরবর্তীকালে তিনি পুনরায় প্র্যাকটিস শুরু করার (resumption of practice) কোনো আবেদন করেছিলেন কি না এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছিল কি না।
বৈধ শংসাপত্র: বর্তমানে তাঁর নামে প্র্যাকটিস করার কোনো বৈধ শংসাপত্র (valid certificate of practice) রেকর্ডে রয়েছে কি না।
বিসিআই স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা এখনই তাঁর আদালতে উপস্থিতির বৈধতা নিয়ে কোনো মতামত দিচ্ছে না, তবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
মূল আইনি জটিলতা
এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা প্রধান আইনি প্রশ্নটি হল: টানা ১৫ বছর ধরে যিনি একটি সাংবিধানিক পদে (মুখ্যমন্ত্রী) অধিষ্ঠিত ছিলেন— যে সময়ে নিয়ম অনুযায়ী তাঁর আইনি প্র্যাকটিস স্থগিত থাকার কথা— তিনি কি বার কাউন্সিলের নিয়ম মেনে প্র্যাকটিস পুনরায় শুরু করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না করেই সরাসরি আইনজীবীর পোশাকে আদালতে হাজির হতে পারেন?
এই তথ্যানুসন্ধানের প্রক্রিয়া যাতে স্বচ্ছ থাকে, তার জন্য বিসিআই নির্দেশ দিয়েছে যে সমস্ত মূল নথি (original records) সুরক্ষিত রাখতে হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নথিতে কোনো রকম পরিবর্তন, সংশোধন বা ওভাররাইটিং (overwriting) করা যাবে না।
আদালতে বিপক্ষের যুক্তি
আদালতে রাজ্যের হয়ে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল (ASG) অশোক চক্রবর্তী এই পিটিশনের বিরোধিতা করে যুক্তি দেন যে, অভিযোগগুলোকে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং "নির্দিষ্ট দৃষ্টান্তের মাধ্যমে প্রমাণ" করতে হবে। পাশাপাশি, পুলিশের আইনজীবীও আদালতকে জানান যে এই অভিযোগগুলির ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে।


