স্পোর্টস ডেস্ক | ভিউজ নাও
বিশ্বকাপের মঞ্চে বড় দল ও আন্ডারডগের লড়াই প্রায়ই জন্ম দেয় নতুন গল্পের। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার রাতে ঠিক তেমনই এক রূপকথার সাক্ষী থাকল ফুটবল বিশ্ব। এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল ইরানের বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াই করে ২-২ গোলের ড্র ছিনিয়ে নিয়েছে নিউজিল্যান্ড। ফলাফলটি শুধু একটি পয়েন্ট ভাগাভাগির গল্প নয়; এটি ছিল কৌশল, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের এক অসাধারণ প্রদর্শনী।
ম্যাচের আগে অধিকাংশ বিশ্লেষকই ইরানকে স্পষ্ট ফেবারিট হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু মাঠে নেমে সেই হিসাব ওলটপালট করে দেয় কিউইরা। বিশেষ করে এলিজাহ জাস্টের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স নিউজিল্যান্ডকে এনে দেয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় এক রাত।
শুরুতেই চমক
ম্যাচের মাত্র সপ্তম মিনিটেই প্রথম আঘাত হানে নিউজিল্যান্ড। দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন উইঙ্গার এলিজাহ জাস্ট। অপ্রত্যাশিত এই গোলে কিছুটা চাপে পড়ে যায় ইরান।
তবে অভিজ্ঞ দল হিসেবে দ্রুতই নিজেদের গুছিয়ে নেয় তারা। ৩২ মিনিটে রামিন রেজায়িয়ানের শক্তিশালী শটে সমতায় ফেরে ইরান। প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-১ সমতায়।
দ্বিতীয়ার্ধেও নাটকীয়তা অব্যাহত থাকে। ৫৪ মিনিটে আবারও গোল করে নিউজিল্যান্ডকে এগিয়ে দেন জাস্ট। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ইতিহাস গড়েন তিনি। কিন্তু ইরানও হাল ছাড়েনি। ৬৪ মিনিটে মোহাম্মদ মহেবির নিখুঁত হেডে আবারও সমতায় ফেরে এশিয়ান প্রতিনিধিরা।
বাকি সময় উভয় দলই জয়ের জন্য চেষ্টা চালালেও আর কোনো গোল হয়নি। ফলে ২-২ ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়ে দুই দল।
এলিজাহ জাস্টের ইতিহাস
এই ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম নিঃসন্দেহে এলিজাহ জাস্ট।
২৬ বছর বয়সী এই উইঙ্গার নিউজিল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের মূল পর্বে এক ম্যাচে জোড়া গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। তার গতি, পজিশনিং এবং ফিনিশিং পুরো ম্যাচে ইরানের রক্ষণভাগকে বিপাকে ফেলেছিল।
জাস্টের দুই গোলের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার ক্রিস উডের। নিজের শারীরিক শক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইরানের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রেখে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করেন নটিংহ্যাম ফরেস্ট তারকা।
কৌশলের লড়াইয়ে সফল নিউজিল্যান্ড
ইরান তাদের পরিচিত ৪-২-৩-১ ফরমেশনে মাঠে নামে। মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে মেহেদি তারেমিকে কেন্দ্র করে আক্রমণ সাজানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের।
অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড বেছে নেয় রক্ষণভাগকে অগ্রাধিকার দেওয়া ৪-৪-২ ফরমেশন। ডিপ ডিফেন্সিভ ব্লক গড়ে তারা ইরানের আক্রমণ প্রতিহত করে এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠে। কোচের এই পরিকল্পনা প্রায় নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয় অল হোয়াইটসরা।
নিষ্প্রভ তারেমি
ইরানের অন্যতম বড় ভরসা মেহেদি তারেমি এদিন নিজের সেরাটা দিতে পারেননি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৪২ গোল করা এই স্ট্রাইকারকে পুরো ম্যাচ জুড়ে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে নিউজিল্যান্ডের রক্ষণভাগ।
নকআউট পর্বে যাওয়ার আশা টিকিয়ে রাখতে হলে আগামী ম্যাচগুলোতে তারেমির কাছ থেকে আরও কার্যকর অবদান প্রয়োজন হবে ইরানের।
মাঠের বাইরের রাজনৈতিক উত্তাপ
ম্যাচের বাইরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরানকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। স্টেডিয়ামের বাইরে শত শত বিক্ষোভকারী তেহরানের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় গ্যালারির একটি অংশ থেকে দুয়ো ধ্বনিও শোনা যায়। মাঠের বাইরের এই উত্তেজনা খেলোয়াড়দের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করেছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গ্রুপ ‘জি’-তে নজিরবিহীন সমতা
একই দিনে গ্রুপের অন্য ম্যাচে বেলজিয়াম ও মিশর ১-১ গোলে ড্র করায় চার দলেরই পয়েন্ট এখন সমান।
| দল | ম্যাচ | জয় | ড্র | হার | গোল পক্ষে | গোল বিপক্ষে | পয়েন্ট |
|---|---|---|---|---|---|---|---|
| নিউজিল্যান্ড | ১ | ০ | ১ | ০ | ২ | ২ | ১ |
| ইরান | ১ | ০ | ১ | ০ | ২ | ২ | ১ |
| বেলজিয়াম | ১ | ০ | ১ | ০ | ১ | ১ | ১ |
| মিশর | ১ | ০ | ১ | ০ | ১ | ১ | ১ |
চার দলেরই পয়েন্ট ও গোল ব্যবধান সমান থাকায় গ্রুপ ‘জি’-র লড়াই এখন পুরোপুরি উন্মুক্ত। পরবর্তী ম্যাচগুলো কার্যত নকআউটের রূপ নিতে যাচ্ছে।
সামনে কী?
ইরানের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে আক্রমণভাগকে আরও ধারালো করা এবং তারেমিকে ছন্দে ফেরানো। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড এই আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে পারলে গ্রুপ থেকে উত্তরণের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
বিশ্বকাপের শুরুতেই এমন নাটকীয় ফলাফল আবারও মনে করিয়ে দিল—ফুটবলে কোনো দলই ছোট নয়। আর সেই কারণেই বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে অনিশ্চিত এবং রোমাঞ্চকর টুর্নামেন্ট।






