ভিউস নাও বিশেষ প্রতিবেদন:
একটি ফুটবল ম্যাচের দৈর্ঘ্য ৯০ মিনিট। এই দেড় ঘণ্টার মধ্যেই পৃথিবীর দুই প্রান্তে রচিত হচ্ছে দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার গল্প। একদিকে সমাজের অন্ধকার পরিসংখ্যান, অন্যদিকে নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
ভারতের সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারীর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা এখনও এক ভয়াবহ সামাজিক বাস্তবতা। বিভিন্ন বছরে প্রকাশিত তথ্য দেখিয়েছে, গড়ে প্রতি কয়েক মিনিট অন্তর দেশের কোথাও না কোথাও একজন নারী ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করছেন। সেই হিসেবে একটি ফুটবল ম্যাচের ৯০ মিনিটে একাধিক নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে আইনের দ্বারস্থ হন। আর যাঁরা সামাজিক ভয়, পারিবারিক চাপ বা বিচারহীনতার আশঙ্কায় অভিযোগই জানাতে পারেন না, তাঁদের সংখ্যা থেকে যায় পরিসংখ্যানের বাইরে।
ঠিক সেই সময়, ভারত থেকে প্রায় ১৩,৭০০ কিলোমিটার দূরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা গেল এক ভিন্ন দৃশ্য। সাউথ আফ্রিকা ও চেকিয়ার মধ্যকার ম্যাচে ২২ জন পুরুষ ফুটবলারের খেলা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তিন নারী ম্যাচ অফিসিয়াল। প্রধান রেফারি টোরি পেনসো এবং সহকারী রেফারি ব্রুকি মায়ো ও ক্যাথরিন নেসবিট নিজেদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
এটি নিছক একটি ম্যাচ পরিচালনার ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ-প্রধান হিসেবে বিবেচিত একটি ক্ষেত্রের ভেতরে নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি ও সক্ষমতার স্বীকৃতি। কয়েক বছর আগেও যা কল্পনার বিষয় ছিল, আজ তা বিশ্ব ফুটবলের বাস্তবতা। কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের স্টেফানি ফ্র্যাপার্ট পুরুষদের বিশ্বকাপ ম্যাচ পরিচালনা করে ইতিহাস গড়েছিলেন। সেই পথ ধরেই আজ আরও বেশি নারী আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন।
এই দুই দৃশ্য—একদিকে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার খবর, অন্যদিকে নারীর নেতৃত্বে পরিচালিত বিশ্বমঞ্চ—আসলে আমাদের সমাজের দুই বিপরীত মুখ তুলে ধরে। এক মুখে রয়েছে বৈষম্য, ভয় এবং অসুরক্ষা; অন্য মুখে রয়েছে আত্মবিশ্বাস, সমতা এবং সম্ভাবনা।
ফুটবল তাই আজ শুধুই একটি খেলা নয়। বিশ্বকাপও কেবল গোল, জয়-পরাজয় কিংবা ট্রফির লড়াই নয়। এটি সমাজের পরিবর্তনের গল্পও বলে। আটলান্টার মাঠে তিন নারী রেফারির দৃঢ় উপস্থিতি যেন একটি নীরব বার্তা—নারীরা আর কেবল দর্শক নন, তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতেও সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত।
ভারতের মতো দেশে যখন নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন এখনও জোরালো, তখন আটলান্টার সেই ৯০ মিনিট মনে করিয়ে দেয়, পরিবর্তন সম্ভব। তবে সেই পরিবর্তন কেবল স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে নয়, সমাজের প্রতিটি রাস্তা, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র এবং ঘরের ভেতরেও পৌঁছাতে হবে।
সম্ভবত এটাই এই ৯০ মিনিটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—সমতার লড়াই এখনও শেষ হয়নি, কিন্তু সেই লড়াইয়ের মাঠে নারীরা আজ আর প্রান্তিক চরিত্র নন; তাঁরা নিজস্ব পরিচয়ে, নিজেদের সক্ষমতায়, ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখছেন।


