কলকাতা, ২২ জুন: পশ্চিমবঙ্গের নবগঠিত বিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট পেশ করেছেন। সরকার এই বাজেটকে "উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও জনকল্যাণের রূপরেখা" হিসেবে তুলে ধরলেও শ্রমিক সংগঠন, বামপন্থী অর্থনীতিবিদ এবং গণআন্দোলনের কর্মীদের একাংশের মতে, বাজেটের প্রকৃত চরিত্র বিচার করতে হবে এর ঘোষণার জৌলুসে নয়, বরং এর সুফল কারা পাচ্ছে সেই প্রশ্নে।
বাজেট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে একদিকে কিছু কল্যাণমূলক প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও অন্যদিকে শিল্পায়ন, স্থায়ী কর্মসংস্থান, সংখ্যালঘু শিক্ষা এবং শ্রমিক অধিকারের প্রশ্নে একাধিক উদ্বেগের জায়গা রয়ে গেছে।
কর্মসংস্থান: নতুন চাকরি নয়, শূন্যপদ পূরণের প্রতিশ্রুতি
সরকারের অন্যতম বড় ঘোষণা এক লক্ষ সরকারি চাকরি পূরণ। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকল্প নয়; দীর্ঘদিন ধরে খালি থাকা সরকারি পদ পূরণের প্রশাসনিক উদ্যোগ মাত্র।
বেকারত্বের চাপে জর্জরিত পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্প, উৎপাদনকেন্দ্র বা বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রকল্পের উল্লেখ বাজেটে নেই বললেই চলে। শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, প্রকৃত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হলে পরিকল্পিত শিল্পায়ন, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সুরক্ষা আইনকে শক্তিশালী করতে হবে।
অঙ্গনওয়াড়ি ও আশা কর্মীদের ভাতা বৃদ্ধি: সংগ্রামের আংশিক স্বীকৃতি
বাজেটে অঙ্গনওয়াড়ি (ICDS) ও আশা কর্মীদের মাসিক ভাতা ৫,০০০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা নিঃসন্দেহে লক্ষাধিক মহিলা কর্মীর দীর্ঘ আন্দোলনের ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, ভাতা বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও সমস্যার মূল জায়গা রয়ে গেছে। এখনও এই কর্মীরা স্থায়ী সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা, পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা ও চাকরির নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। ফলে ভাতা বৃদ্ধি তাঁদের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি আনলেও শ্রমিক অধিকারের প্রশ্নে মৌলিক পরিবর্তন ঘটায় না।
একইসঙ্গে ৫০ হাজার ICDS কেন্দ্র আধুনিকীকরণের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক (ADB)-এর অর্থায়নে ২,১৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, সামাজিক পরিকাঠামো উন্নয়ন জরুরি হলেও বিদেশি ঋণনির্ভর মডেল দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে।
অন্নপূর্ণা প্রকল্পে ৩৬ হাজার কোটি: কল্যাণ নাকি কর্মসংস্থানের বিকল্প?
মহিলাদের জন্য অন্নপূর্ণা প্রকল্পে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দকে সরকার বড় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু বামপন্থী মহলের প্রশ্ন, নগদ সহায়তা কি কর্মসংস্থানের বিকল্প হতে পারে?
তাদের মতে, রাজ্যে নারী বেকারত্ব ও অনিশ্চিত শ্রমের সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে। নগদ সহায়তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা, নগর এলাকায় কর্মসংস্থান প্রকল্প এবং শিল্পক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত চাকরির সুযোগ তৈরির মতো পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।
সরকারি কর্মীদের DA বৃদ্ধি: স্বস্তি, কিন্তু অসম্পূর্ণ সমাধান
সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (DA) বৃদ্ধির ঘোষণা বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এর ফলে মোট DA বেড়ে ৩৮ শতাংশে পৌঁছাবে।
কর্মচারী সংগঠনগুলির মতে, মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও সপ্তম বেতন কমিশনের পূর্ণ বাস্তবায়ন, নিয়মিত বেতন পুনর্বিবেচনা এবং পেনশন সুরক্ষার প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
সংখ্যালঘু শিক্ষায় বরাদ্দ হ্রাস নিয়ে বিতর্ক
বাজেটে মাদ্রাসা ও সংখ্যালঘু শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার কর্মীদের একাংশের মতে, সংখ্যালঘু শিক্ষার উন্নয়ন সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। আর্থিক বরাদ্দ কমানো হলে দরিদ্র মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। বামপন্থী মহল এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছে।
উত্তরবঙ্গ: উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, নাকি বঞ্চনার ধারাবাহিকতা?
উত্তরবঙ্গের আটটি জেলার জন্য ৯২০ কোটি টাকার বরাদ্দকে পর্যাপ্ত মনে করছেন না অনেকেই। তাঁদের দাবি, জনসংখ্যা, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং পরিকাঠামোগত ঘাটতির তুলনায় এই বরাদ্দ অপ্রতুল।
সিলিগুড়ি, মালদা, কোচবিহারসহ উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শিল্প, সেচ, রেল ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৃহত্তর বিনিয়োগের দাবি দীর্ঘদিনের।
ঋণনির্ভর বাজেট নিয়ে উদ্বেগ
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে রাজ্যের আর্থিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ৬২,৪২৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি ১,০৫,৩৮৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, উন্নয়নের জন্য ঋণ গ্রহণ অস্বাভাবিক নয়। তবে ঋণের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে রাজ্যের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাঁদের মতে, রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য বড় কর্পোরেট সংস্থা ও উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীর উপর কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কেন্দ্র-রাজ্য আর্থিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন
বাজেট আলোচনায় কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক নীতিরও সমালোচনা উঠে এসেছে। রাজ্যের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পে বকেয়া অর্থ এবং কেন্দ্রের আর্থিক বণ্টন নীতির কারণে পশ্চিমবঙ্গ তার প্রাপ্য অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বামপন্থী মহলের বক্তব্য, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হলে রাজ্যগুলির আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং কেন্দ্রীয় কর বণ্টনে অধিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-২৭-এ কিছু কল্যাণমূলক ঘোষণা এবং সীমিত স্বস্তির ব্যবস্থা থাকলেও স্থায়ী কর্মসংস্থান, শ্রমিক অধিকার, সংখ্যালঘু শিক্ষা, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং শিল্পায়নের মতো মৌলিক প্রশ্নে স্পষ্ট রূপরেখার অভাব চোখে পড়ছে।
শ্রমিক সংগঠন ও বামপন্থী অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাজেট মূলত কল্যাণমূলক প্রকল্প ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সমন্বয় হলেও শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো রূপান্তরমূলক কর্মসূচি এতে অনুপস্থিত।
তাঁদের দাবি, প্রকৃত জনমুখী বাজেট সেই বাজেটই, যা কর্মসংস্থান, শ্রমিক অধিকার, সামাজিক ন্যায় এবং অর্থনৈতিক সমতার প্রশ্নকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেয়।


