নয়াদিল্লি/কলকাতা | শংকর পাল
ভারতের রাজনীতিতে নির্বাচনের ফলাফল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও কখনও কখনও বেশি আলোচিত হয়ে ওঠে নির্বাচনের পরের রাজনৈতিক সমীকরণ। ভোটে জনগণ যে রায় দেন, সেই রায়কে সম্মান জানানো হবে, নাকি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভাঙিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করা হবে—এই প্রশ্ন গত এক দশকে বারবার উঠে এসেছে। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার উঠে এসেছে বিজেপির নাম।
সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশের সাংসদদের সম্ভাব্য দলত্যাগ এবং নবগঠিত ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (NCPI)-তে যোগদানের জল্পনা সেই পুরনো বিতর্ককেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি দলবদল নয়; বরং দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপির বিরুদ্ধে ওঠা তথাকথিত ‘অপারেশন লোটাস’-এর আরও একটি অধ্যায় হতে পারে।
‘অপারেশন লোটাস’ কী?
ভারতের রাজনৈতিক অভিধানে ‘অপারেশন লোটাস’ শব্দবন্ধটি প্রথম আলোচনায় আসে কর্ণাটকে। অভিযোগ ছিল, বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রভাবিত করে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে। পরবর্তীকালে মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গোয়া, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, উত্তরাখণ্ডসহ একাধিক রাজ্যে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে।
বিজেপি অবশ্য বরাবরই দাবি করেছে, বিরোধী দলের নেতারা স্বেচ্ছায় তাদের উন্নয়নমুখী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন—যদি সত্যিই আদর্শের প্রশ্ন থাকে, তাহলে নির্বাচনের আগে দল পরিবর্তন না করে নির্বাচনের পরেই কেন এই দলবদলের ঢেউ দেখা যায়?
বাংলার মাটিতে পুরনো খেলা?
পশ্চিমবঙ্গে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে আগ্রাসী রাজনৈতিক অবস্থান নেয়। একাধিক সাংসদ, বিধায়ক এবং নেতা বিজেপিতে যোগ দেন। তখন বিজেপির অনেক নেতা দাবি করেছিলেন, তৃণমূলের সরকার খুব দ্রুত ভেঙে পড়বে।
কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন সেই হিসাব বদলে দেয়। বিজেপি বিপুল অর্থ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করেও বাংলায় ক্ষমতায় আসতে পারেনি। বরং তৃণমূল কংগ্রেস আরও বড় ব্যবধানে জয়ী হয়। যাঁরা দল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই নির্বাচনে পরাজিত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলার মানুষ সেই নির্বাচনে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন—দলবদল আর প্রচারই সব নয়, ভোটারদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিচারবোধ রয়েছে।
NCPI: নতুন দল নাকি রাজনৈতিক সেতুবন্ধন?
ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা NCPI এখনও পর্যন্ত জাতীয় স্তরে পরিচিত কোনও বড় রাজনৈতিক শক্তি নয়। ২০২৩ সালে নিবন্ধিত এই দলটির সাংগঠনিক শক্তি, গণভিত্তি বা নির্বাচনী সাফল্য সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জনসমক্ষে নেই।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, যদি সত্যিই কোনও বড় সংখ্যক সাংসদ এই দলে যোগ দেন, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ভিত্তি কী?
সমালোচকদের একাংশের মতে, দেশের রাজনীতিতে অনেক সময় ছোট বা নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে বড় রাজনৈতিক শক্তির কৌশলগত সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করা হয়। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে এখনও কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ সামনে আসেনি, তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই দেখছেন।
তদন্তকারী সংস্থা ও রাজনৈতিক চাপের বিতর্ক
গত কয়েক বছরে বিরোধী দলগুলির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা যেমন ED, CBI ও আয়কর দফতরের সক্রিয়তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, বিজেপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তদন্ত শুরু হয়, কিন্তু একই ব্যক্তি বিজেপিতে যোগ দিলেই তদন্তের গতি কমে যায় বা রাজনৈতিক চাপ কমে যায়। এই অভিযোগ বহুবার সংসদ থেকে রাজপথ পর্যন্ত উঠেছে।
বিজেপি অবশ্য এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, আইন আইনের পথেই চলে এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলি স্বাধীনভাবে কাজ করে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, কেন এত সংখ্যক বিরোধী নেতা তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার পর বিজেপির কাছাকাছি চলে আসেন?
গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক প্রবণতা?
ভারতের সংবিধান জনগণের রায়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। ভোটাররা একটি রাজনৈতিক দল, একটি মতাদর্শ এবং একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির উপর আস্থা রেখে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন।
কিন্তু নির্বাচনের পরে যদি সেই প্রতিনিধি অন্য রাজনৈতিক শিবিরে চলে যান, তাহলে ভোটারদের দেওয়া ম্যান্ডেটের কী মূল্য থাকে?
বিশিষ্ট সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দলত্যাগ বিরোধী আইন থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলবদল ভারতের গণতন্ত্রের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে নির্বাচনী রাজনীতিতে আদর্শের পরিবর্তে ক্ষমতার সমীকরণ বেশি গুরুত্ব পায়।
বাংলার মানুষ কি আবারও বার্তা দেবেন?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এই রাজ্যের ভোটাররা অনেক সময় জাতীয় প্রবণতার বিপরীতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের উত্থান, ২০১১ সালে তৃণমূলের ক্ষমতায় আসা কিংবা ২০২১ সালে বিজেপির প্রবল প্রচারের মাঝেও তৃণমূলের জয়—সব ক্ষেত্রেই বাংলার ভোটাররা নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
তাই সম্ভাব্য কোনও দলবদল বা নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের উপরই।
তৃণমূল কংগ্রেসের সম্ভাব্য ভাঙন নিয়ে যতই জল্পনা চলুক না কেন, বড় প্রশ্নটি অন্যত্র। ভারতের রাজনীতি কি আদর্শ, নীতি ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে এগোবে, নাকি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভাঙিয়ে সংখ্যার অঙ্ক মেলানোর রাজনীতি আরও শক্তিশালী হবে?
বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, বিজেপি গত এক দশকে সেই দ্বিতীয় পথকেই বেছে নিয়েছে। বিজেপি অবশ্য দাবি করে, তারা কেবল জনগণের সমর্থন এবং উন্নয়নের রাজনীতি করছে।
সত্য যাই হোক, দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে জনগণই। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—সরকার, দল, নেতা সবাই পরিবর্তনশীল; কিন্তু জনগণের রায়ই শেষ কথা।
"ভোটে নয়, ভাঙনে ক্ষমতার সমীকরণ? নতুন বিতর্কে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল"



