" " //psuftoum.com/4/5191039 Live Web Directory যত দোষ সব অনিল বসু, যত জল সব নন্দরানী ডল? ইতিহাস, মিডিয়া আর বামবিরোধী ন্যারেটিভের অজানা গল্প //whairtoa.com/4/5181814
Type Here to Get Search Results !

যত দোষ সব অনিল বসু, যত জল সব নন্দরানী ডল? ইতিহাস, মিডিয়া আর বামবিরোধী ন্যারেটিভের অজানা গল্প

 



শংকর পাল | বিশেষ প্রতিবেদন


পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাঁদের অবদান, সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক জীবনকে ছাপিয়ে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে কিছু বিশেষ তকমা। আরামবাগের সাতবারের সাংসদ কমরেড অনিল বসু এবং কেশপুরের তিনবারের বিধায়ক কমরেড নন্দরানী ডল সেই দুই নাম, যাঁদের ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক সময়ের বহুল প্রচারিত ‘ছাপ্পা ভোট’ ন্যারেটিভ।


কিন্তু প্রশ্ন হল—তাঁরা কি সত্যিই সেই পরিচয়ের মানুষ, নাকি রাজনৈতিক লড়াইয়ের এক পর্যায়ে তাঁদেরকে প্রতীকে পরিণত করা হয়েছিল বামপন্থীদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রচারের অংশ হিসেবে?


কমরেড অনিল বসুকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন তিনি ছিলেন পার্টির প্রতি অসাধারণভাবে অনুগত একজন কর্মী। রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্বে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও তিনি প্রকাশ্যে দলের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। বরং বহু সভা-মিছিলে নীরবে উপস্থিত থেকেছেন, এক কোণে দাঁড়িয়ে শুনেছেন দলের বক্তব্য। আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেখানে দলত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে নেতারা দলবিরোধী প্রচারে নামেন, সেখানে অনিল বসুর নীরবতা এবং শৃঙ্খলা এক বিরল রাজনৈতিক উদাহরণ।


তবুও বাংলার বহু মানুষের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে উঠলেন অন্য এক পরিচয়ে। কারণ তিনি টানা সাতবার লোকসভা নির্বাচনে জিতেছিলেন। কারণ আরামবাগে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল প্রশ্নাতীত। কারণ ২০০৪ সালে তাঁর জয়ের ব্যবধান পাঁচ লক্ষ ভোট ছাড়িয়ে গিয়েছিল।


সেই সময় বাংলার একাংশ সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এই বিপুল জনসমর্থনের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে সহজতম পথ বেছে নেয়—‘ছাপ্পা ভোট’ তত্ত্ব। ধীরে ধীরে অনিল বসু হয়ে ওঠেন সেই অভিযোগের মুখ, আর বামফ্রন্ট হয়ে ওঠে নির্বাচনী কারচুপির প্রতীক।


একই চিত্র দেখা যায় কেশপুরে।


১৯৯৮ থেকে ২০০১—পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুর ছিল রাজনৈতিক সংঘর্ষের অন্যতম কেন্দ্র। বিরোধীরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিল, “কেশপুরকে সিপিএমের শেষপুর বানানো হবে।” কিন্তু ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সমস্ত রাজনৈতিক জল্পনাকে উড়িয়ে দিয়ে নন্দরানী ডল এক লক্ষেরও বেশি ভোটে জয়ী হন।


এরপর শুরু হয় আর এক পর্ব। কেশপুরের ফলাফলকে সামনে রেখে গোটা বামফ্রন্ট সরকারের গণভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলে। নন্দরানী ডল হয়ে ওঠেন সেই আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য।


কিন্তু ইতিহাসের আর এক অধ্যায় অনেক সময়ই আলোচনায় আসে না।


২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে একই কেশপুর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী শিউলি সাহা এক লক্ষেরও বেশি ভোটে জয়ী হন। তখন আর সেই ফলাফল নিয়ে ‘গণতন্ত্র বিপন্ন’, ‘অস্বাভাবিক ব্যবধান’, ‘কারচুপি’—এসব প্রশ্ন সংবাদমাধ্যমের বড় অংশে শোনা যায়নি।


একইভাবে সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবারে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাত লক্ষেরও বেশি ভোটে জয়ও বড় কোনও বিতর্কের জন্ম দেয়নি।


ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—একই ধরনের ফলাফল ভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয় কেন?


বামপন্থী মহলের দাবি, নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে বামফ্রন্টকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার লক্ষ্যে একটি ধারাবাহিক প্রচার চালানো হয়েছিল। সেই প্রচারে নির্বাচনী ফলাফল, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, এমনকি ব্যক্তিগত চরিত্রহনন পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে।


জঙ্গলমহলের নেতা অনুজ পান্ডেকে ঘিরে ‘সাততলা অট্টালিকা’, ‘অঢেল সম্পত্তি’ নিয়ে যে গল্প একসময় সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়েছিল, তারও বাস্তব ভিত্তি নিয়ে পরে বহু প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু যে প্রচার মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে, তার সংশোধন আর কখনও শিরোনাম হয় না।


আজকের প্রজন্মের বহু তরুণ বামফ্রন্টকে চেনে ‘ছাপ্পা ভোট’ বা ‘বন্ধের রাজনীতি’ দিয়ে। অথচ ভূমি সংস্কার, পঞ্চায়েতের ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা কিংবা শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ইতিহাস সম্পর্কে তাদের জানার সুযোগ অনেক কম।


রাজনীতির ময়দানে পরাজয়-জয় আসবে যাবে। কিন্তু ইতিহাসের আদালতে প্রশ্ন থেকে যাবে—একটি রাজনৈতিক শক্তির চার দশকের শাসনকে কি শুধুমাত্র কয়েকটি প্রচারিত অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায়?


অনিল বসু কিংবা নন্দরানী ডল হয়তো সেই প্রশ্নেরই প্রতীক। তাঁদের নাম উচ্চারিত হলেই আজও মনে পড়ে যায়—কখনও কখনও ইতিহাস শুধু ঘটনায় নয়, বরং কে সেই ঘটনা বলছে এবং কীভাবে বলছে, তার উপরও নির্ভর করে।


আর সেই কারণেই আজ বামপন্থীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়, নিজেদের ইতিহাস, অর্জন এবং বাস্তবতাকে নতুন প্রজন্মের সামনে নতুন ভাষায় তুলে ধরা। কারণ ইতিহাস যদি নিজেরা না লেখে, অন্য কেউ লিখে দেবে—আর সেই ইতিহাস সবসময় সত্যের ইতিহাস নাও হতে পারে।

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies