শংকর পাল
ইতিহাসে কিছু মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু তাঁদের স্বপ্নের মৃত্যু হয় না। কিছু মুখ সময়ের সঙ্গে ঝাপসা হয়ে যায়, কিন্তু কিছু মুখ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংগ্রামের পতাকায়, দেয়ালচিত্রে, মিছিলে, কবিতায় এবং মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। চে গেভারা তেমনই এক নাম।
আজ ১৪ জুন। বিপ্লবী নেতা চে গেভারার ৯৮তম জন্মবার্ষিকী। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন মানুষ নন, তিনি একটি ধারণা, একটি প্রতীক, একটি অসমাপ্ত স্বপ্নের নাম।
১৯২৮ সালের এই দিনে আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্ম নিয়েছিলেন আর্নেস্তো গেভারা দে লা সের্না। হাঁপানিতে আক্রান্ত এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেটি একদিন বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিপ্লবীতে পরিণত হবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি।
চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। একজন সফল ডাক্তার হওয়ার সমস্ত সুযোগ ছিল তাঁর সামনে। কিন্তু লাতিন আমেরিকার পথে পথে ঘুরে তিনি দেখলেন অন্য এক বাস্তবতা—ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শোষণ, বঞ্চনা এবং সাম্রাজ্যবাদের নির্মম চেহারা। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে আমূল বদলে দেয়।
তিনি বুঝেছিলেন, অসুস্থ মানুষের শুধু ওষুধ নয়, প্রয়োজন মুক্তিরও। তাই স্টেথোস্কোপের বদলে হাতে তুলে নিয়েছিলেন বিপ্লবের পতাকা।
কিউবার পাহাড়-জঙ্গলে শুরু হয় তাঁর নতুন জীবন। ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি লড়েছিলেন বাতিস্তার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। ১৯৫৯ সালে কিউবান বিপ্লবের বিজয় শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মানুষের মনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিল।
বিপ্লব সফল হওয়ার পর ক্ষমতা, পদ বা আরামের জীবন তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। মন্ত্রীত্ব, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—সবকিছু ছেড়ে তিনি আবার বেরিয়ে পড়েছিলেন নতুন সংগ্রামের খোঁজে। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, পৃথিবীর কোথাও অন্যায় থাকলে সেই লড়াই তাঁরও লড়াই।
আফ্রিকার কঙ্গো, তারপর বলিভিয়া। নতুন বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু ইতিহাস সবসময় স্বপ্নবাজদের প্রতি দয়ালু হয় না।
১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর বলিভিয়ার এক ছোট্ট গ্রামে বন্দি অবস্থায় হত্যা করা হয় চে গেভারাকে। তাঁর বয়স তখন মাত্র ৩৯।
হত্যাকারীরা ভেবেছিল, একটি মানুষকে মেরে ফেললেই হয়তো একটি আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, কিছু মানুষ মৃত্যুর পর আরও বড় হয়ে ওঠেন।
আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে যখন কোনও তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, যখন কোনও শ্রমিক নিজের অধিকার দাবি করে, যখন কোনও ছাত্র সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে—সেখানে কোথাও না কোথাও চে গেভারার ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়।
আলবের্তো কর্দার তোলা সেই বিখ্যাত ছবিটি আজ বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক প্রতীকগুলির একটি। কিন্তু ছবির পেছনের মানুষটি শুধু একটি পোস্টার ছিলেন না। তিনি ছিলেন স্বপ্ন দেখার সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার বিশ্বাস।
ভারতের বামপন্থী আন্দোলনেও চে গেভারার প্রভাব গভীর। পশ্চিমবঙ্গের মিছিল, কেরলের ছাত্র রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল, গ্রন্থাগারের নামফলক—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি অনুভূত হয়। বহু তরুণ-তরুণীর কাছে তিনি এখনও প্রতিবাদের প্রথম পাঠ.
সময় বদলেছে। পৃথিবী বদলেছে। রাজনীতি বদলেছে। কিন্তু চে গেভারার নাম উচ্চারিত হলেই এখনও মানুষের মনে ভেসে ওঠে এক অদম্য সংগ্রামীর মুখ, যে বিশ্বাস করত পৃথিবীকে আরও সুন্দর, আরও ন্যায়ভিত্তিক করা সম্ভব।
আজ তাঁর ৯৮তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন বিপ্লবীকে স্মরণ করা নয়। স্মরণ করা সেই স্বপ্নকে, যা বলে—মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই কখনও বৃথা যায় না।
চে গেভারা আজ নেই। কিন্তু তাঁর চোখের সেই দূরদৃষ্টি, তাঁর কণ্ঠের সেই আহ্বান এবং তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন এখনও পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
হয়তো সেই কারণেই ইতিহাসের পাতায় নয়, মানুষের মনে আজও তাঁর নাম লেখা থাকে—
"হাস্তা লা ভিক্টোরিয়া সিয়েম্প্রে" — বিজয় না আসা পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।









