ডেস্ক রিপোর্ট: সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝি, স্বাধীনতা সংগ্রামী, সাহিত্যিক এবং নারী জাগরণের অন্যতম অগ্রদূত সরলা দেবী চৌধুরাণী। ভিডিওটিতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, নারী সংগঠনের নেতৃত্ব এবং মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। ফলে ইতিহাসপ্রেমী থেকে সাধারণ নেটিজেন—সকলের মধ্যেই নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে।
ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে সরলা দেবী চৌধুরাণীর নাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও মূলধারার আলোচনায় তাঁকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন গবেষকরা। ঠাকুর পরিবারের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একাধারে লেখিকা, সম্পাদক, সংগঠক এবং নারী অধিকার আন্দোলনের পথিকৃৎ।
১৮৭২ সালে জন্মগ্রহণকারী সরলা দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবীর সন্তান। সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা সরলা দেবী খুব অল্প বয়স থেকেই জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের স্বাধীনতা এবং নারীমুক্তি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল’, যা ভারতীয় নারীদের শিক্ষা, সংগঠন এবং আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যে গঠিত প্রথম সর্বভারতীয় সংগঠনগুলির মধ্যে অন্যতম। সে সময় নারীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল। সেই পরিস্থিতিতে সরলা দেবীর এই উদ্যোগ ছিল যুগান্তকারী।
শুধু সামাজিক আন্দোলন নয়, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা ছড়িয়ে দিতে লেখালেখির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রচনায় দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদা এবং নারীশক্তির কথা বারবার উঠে এসেছে।
তবে সাম্প্রতিক ভাইরাল ভিডিওটির মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সরলা দেবীর সম্পর্কের প্রসঙ্গ। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯১৯ সালের পর গান্ধী ও সরলা দেবীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়। তাঁদের মধ্যে নিয়মিত চিঠিপত্র আদান-প্রদান হতো এবং জাতীয় আন্দোলন, সমাজসংস্কার ও ব্যক্তিগত দর্শন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলত।
গান্ধী তাঁর কিছু লেখায় সরলা দেবীকে ‘স্পিরিচুয়াল ওয়াইফ’ বা ‘আধ্যাত্মিক সঙ্গী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। যদিও এই সম্পর্ককে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা ও বিতর্ক রয়েছে। কেউ এটিকে গভীর বৌদ্ধিক বন্ধুত্ব হিসেবে দেখেন, আবার কেউ মনে করেন এটি ছিল গান্ধীর জীবনের একটি জটিল ব্যক্তিগত অধ্যায়।
ভাইরাল ভিডিওতে গান্ধীর একটি বহুল আলোচিত উক্তিও উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেখানে তিনি সরলা দেবীকে উদ্দেশ করে বলেন, “তুমি সারারাত আমাকে তাড়া করলে।” এই উক্তিকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ইতিহাসবিদরা সতর্ক করে বলছেন, কোনও ঐতিহাসিক ঘটনার মূল্যায়ন করতে হলে তার পূর্ণ প্রেক্ষাপট জানা জরুরি।
গবেষকদের মতে, সরলা দেবী চৌধুরাণীকে শুধুমাত্র গান্ধীর সঙ্গে সম্পর্কের আলোকে বিচার করলে তাঁর প্রকৃত অবদান আড়ালে থেকে যায়। নারী শিক্ষা, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ এবং সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এমন এক সময়ে নারীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যখন ভারতীয় সমাজে নারীদের স্বাধীন সামাজিক পরিচয় গড়ে তোলা ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া এই ভিডিওর ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই সরলা দেবী সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হচ্ছেন। ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করছেন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং নারী আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর অবদানকে আরও বিস্তৃতভাবে পাঠ্যক্রম ও জনআলোচনায় তুলে ধরা প্রয়োজন।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও সরলা দেবী চৌধুরাণীর জীবন ও কর্ম ইতিহাসের এক আকর্ষণীয় অধ্যায় হয়ে রয়েছে। আর সেই কারণেই একটি ভাইরাল ভিডিও আবারও ফিরিয়ে এনেছে তাঁকে জনমানসে, নতুন করে শুরু হয়েছে এক বিস্মৃত ইতিহাসের অনুসন্ধান। :::


