কলকাতা | বিশেষ প্রতিবেদন
১৯৪৬ সালের আগস্ট। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে উত্তাল কলকাতা। রাস্তাজুড়ে রক্ত, আগুন আর আতঙ্ক। ইতিহাসে যা ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ নামে পরিচিত, সেই ভয়াবহ সময়ের বহু গল্প আজও বিতর্কে ঘেরা। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেও উঠে আসে মানবতা ও সম্প্রীতির কিছু আলোকিত অধ্যায়।
এমনই এক চরিত্র গোপাল ‘পাঠা’ মুখোপাধ্যায়। দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক থাকলেও তাঁর নিজের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে একটি বিষয়— “মানুষকে বাঁচানোই ছিল প্রথম কাজ।”
যখন পরিচয়ের আগে ছিল মানুষের জীবন
দাঙ্গার সময় কলকাতার বহু এলাকা কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। আতঙ্কিত মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে গোপাল মুখোপাধ্যায় দাবি করেন, তিনি কেবল নিজের সম্প্রদায়ের মানুষকেই নয়, বিপদে পড়া মুসলিম পরিবারগুলিকেও রক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কলেজ স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী মুসলিমদের নিরাপদে থানায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা প্রতিহিংসার শিকার না হন। তাঁর নির্দেশ ছিল, কোনও নিরীহ মানুষের উপর আক্রমণ নয়, বরং জীবন রক্ষা করাই হবে প্রধান লক্ষ্য।
প্রতিশোধ নয়, নিরাপত্তার প্রশ্ন
গোপালের দাবি, অস্ত্র হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রতিশোধের জন্য নয়, আত্মরক্ষার জন্য ছিল। তিনি মনে করতেন, দাঙ্গার সময় প্রশাসনিক শূন্যতার মধ্যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাঁর সংগঠিত দলকে তিনি লুটপাট, অগ্নিসংযোগ বা অপরাধমূলক কাজে অংশ না নেওয়ার নির্দেশ দেন। বরং এলাকার শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর জোর দেন।
গান্ধীর আহ্বান ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
দাঙ্গা থামাতে মহাত্মা গান্ধী শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে কলকাতায় আসেন। গোপাল মুখোপাধ্যায়কে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বানও জানানো হয়।
কিন্তু গোপালের মতে, সম্প্রীতি ও শান্তির আদর্শকে তিনি সম্মান করলেও, মাটির বাস্তব পরিস্থিতিতে তখনও বহু মানুষের জীবন হুমকির মুখে ছিল। সেই কারণেই তিনি অস্ত্র ছাড়তে দ্বিধা করেছিলেন।
এই ঘটনাকে ইতিহাসবিদরা দেখেন এক জটিল দ্বন্দ্ব হিসেবে— একদিকে অহিংসার আদর্শ, অন্যদিকে আক্রান্ত মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
ঘৃণার নয়, সহাবস্থানের শিক্ষা
আজ, আট দশক পরে দাঁড়িয়ে ১৯৪৬-এর সেই রক্তাক্ত অধ্যায় আমাদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে— সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সময় কি কেবল বিভাজনের ইতিহাসই স্মরণ করা হবে, নাকি মানবতার উদাহরণগুলিও সামনে আনা হবে?
গোপাল ‘পাঠা’ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণে উঠে আসা মুসলিম পরিবারদের রক্ষা করার ঘটনা, নিরীহ মানুষকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ এবং লুটপাটের বিরোধিতা— ইতিহাসের সেই অন্ধকার সময়েও সম্প্রীতির সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়।
ইতিহাসের শিক্ষা
১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু সেই ভয়াবহতার মধ্যেও বহু সাধারণ মানুষ ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে একে অপরকে রক্ষা করেছিলেন।
আজকের সময়ে সেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই— সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সমাজকে ধ্বংস করে, আর মানবতা ও সম্প্রীতিই পারে মানুষকে মানুষ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখতে।
দাঙ্গার স্মৃতি যতই বেদনাদায়ক হোক, ইতিহাসের পাতায় মানবিকতার এই গল্পগুলোই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।


