১ জুলাই—ভারতের চিকিৎসা জগতের জন্য এক অত্যন্ত গৌরবের দিন। প্রতি বছর এই দিনটি জাতীয় চিকিৎসক দিবস (National Doctors' Day) হিসেবে পালিত হয়। দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে চলা চিকিৎসকদের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা এবং সম্মান জানাতেই এই বিশেষ দিনটির সূচনা।
এই দিনটি উৎসর্গ করা হয়েছে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, শিক্ষাবিদ এবং পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়-এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে। ইতিহাসের এক বিরল কাকতালীয় ঘটনায় তিনি ১৮৮২ সালের ১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৬২ সালের একই দিনে প্রয়াত হন। তাঁর অসামান্য অবদানকে সম্মান জানিয়ে ভারত সরকার ১৯৯১ সালে ১ জুলাইকে জাতীয় চিকিৎসক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
একজন কিংবদন্তি চিকিৎসকের জীবন
বিহারের পাটনায় জন্ম নেওয়া ডা. বিধানচন্দ্র রায় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই MRCP এবং FRCS-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে তিনি চিকিৎসা পরিষেবাকে শুধু পেশা হিসেবে নয়, মানবসেবার ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন চিকিৎসকের কাজ কেবল রোগ নিরাময় নয়; একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলাও তাঁর দায়িত্ব। সেই ভাবনা থেকেই তিনি হাসপাতাল, মেডিক্যাল শিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। Indian Medical Association এবং Medical Council of India-এর প্রতিষ্ঠা ও বিকাশেও তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতা সংগ্রামী থেকে মুখ্যমন্ত্রী
ডা. রায় ছিলেন মহাত্মা গান্ধী-র ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্যতম। একই সঙ্গে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেশভাগের ধাক্কা সামলে একটি নতুন রাজ্য গড়ে তোলার কঠিন দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে।
তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নগর পরিকল্পনার এক নতুন যুগের সূচনা হয়।
দুর্গাপুর: ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের স্বপ্নের শিল্পনগরী
আজকের আধুনিক দুর্গাপুর কেবল একটি শহর নয়, এটি ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের সুদূরপ্রসারী শিল্পভাবনার বাস্তব রূপ।
স্বাধীনতার পর ভারতের শিল্পায়নের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু-র সঙ্গে সমন্বয় করে পশ্চিমবঙ্গে ভারী শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। সেই পরিকল্পনার ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা, শিল্পাঞ্চল, আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সড়ক ও আধুনিক নাগরিক পরিকাঠামো।
দুর্গাপুরকে পরিকল্পিতভাবে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল যাতে শিল্প, পরিবেশ, শিক্ষা ও নাগরিক জীবন একসঙ্গে বিকশিত হতে পারে। এই কারণেই দুর্গাপুরকে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অন্যতম সফল পরিকল্পিত শিল্পনগরী হিসেবে গণ্য করা হয়।
আজও দুর্গাপুরের অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক নগর পরিকল্পনার ভিত বহন করে চলেছে ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের সেই ঐতিহাসিক স্বপ্নকে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে অমর অবদান
ডা. রায় মনে করতেন, একটি শক্তিশালী জাতি গড়তে উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং মানসম্মত শিক্ষা অপরিহার্য। তাঁর উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গে বহু হাসপাতাল, মেডিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাতৃসদন, শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং জনস্বাস্থ্য প্রকল্প গড়ে ওঠে।
চিকিৎসাকে তিনি মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখতেন। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আজও দেশের স্বাস্থ্যনীতিতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
ভারত রত্ন সম্মান
দেশের চিকিৎসা, সমাজসেবা এবং প্রশাসনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬১ সালে তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারত রত্ন প্রদান করা হয়।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য
জাতীয় চিকিৎসক দিবস ২০২৬-এর মূল প্রতিপাদ্য "Behind the Mask: Who Heals the Healers?"। এই বার্তা মনে করিয়ে দেয়, যাঁরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচান, তাঁদের নিজেদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আজকের প্রেক্ষাপটে জাতীয় চিকিৎসক দিবস
প্রযুক্তির অগ্রগতি, নতুন নতুন রোগের চ্যালেঞ্জ এবং জনস্বাস্থ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যেও চিকিৎসকেরা দিন-রাত নিরলসভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁদের নিষ্ঠা, সাহস ও মানবিকতা সমাজকে প্রতিনিয়ত নতুন আশার আলো দেখায়।
জাতীয় চিকিৎসক দিবস তাই শুধু একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি মানবসেবার প্রতি অঙ্গীকার, চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
বিশেষ করে দুর্গাপুরের মানুষের কাছে এই দিনটির আবেগ আরও গভীর। কারণ, এই শহরের পরিকল্পনা, শিল্পায়ন এবং আধুনিক বিকাশের সঙ্গে ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তাঁর স্বপ্ন, দৃষ্টিভঙ্গি এবং নেতৃত্বের ফলেই দুর্গাপুর আজ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।


