দুর্গাপুর, ৩১ জুলাই:
আজকের মেলাঘেঁষা ভোর কেবল এক নতুন দিনের সূচনা ছিল না, ছিল শোষিত, বঞ্চিত আর শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বরকে নতুন করে ঝালাই করে নেওয়ার ভোর। আধুনিক হিন্দী ও উর্দু সাহিত্যের রূপকার, প্রগতিশীল সাহিত্য ভাবনার মুকুটহীন সম্রাট মুন্সী প্রেমচাঁদের ১৪৬-তম জন্মবার্ষিকীতে আজ সকালেই আবেগে ও শ্রদ্ধায় সিক্ত হলো ইস্পাত নগরী দুর্গাপুর।
আয়োজকদের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, আজ ৩১ জুলাই সকাল ঠিক ৬:৩০ মিনিটে ইস্পাত নগরীর ট্রাঙ্ক রোড রোটারীতে একত্রিত হয়েছিলেন শহরের প্রগতিশীল সাহিত্যপ্রেমী, কবি, লেখক ও সচেতন নাগরিকেরা। 'মুন্সী প্রেমচাঁদ সাংস্কৃতিক মঞ্চ' (দুর্গাপুর) এবং 'জনবাদী লেখক সংঘ' (দুর্গাপুর সমগ্র)-এর যৌথ আহ্বানে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে মহান সাহিত্যিকের আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পার্ঘ্য ও মাল্যদান করা হয়।
ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা: ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কলমের লড়াই
পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের পর উপস্থিত প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মীরা স্মরণ করেন প্রেমচাঁদের সেই ঐতিহাসিক অবদানকে। ১৯৩৬ সালে সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের করাল থাবার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লখনউয়ের মাটিতে জন্ম নিয়েছিল ভারতের প্রথম প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন 'প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন'। সেই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে মুন্সী প্রেমচাঁদের দেওয়া দিকনির্দেশনা আজও প্রগতিশীল সাহিত্যের মূল চালিকাশক্তি।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, প্রেমচাঁদ সাহিত্যকে কেবল অলঙ্কার বা বিনোদনের খোলসে আটকে রাখেননি; তিনি তাকে বানিয়েছিলেন সমাজের অসাম্য, শোষণের বিরুদ্ধে এক ধারালো হাতিয়ার।
বর্তমানের অন্ধকার বনাম প্রগতির প্রদীপ
আজকের সকালে প্রেমচাঁদের আবক্ষ মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে উঠে আসে বর্তমান সময় ও সমাজের এক যন্ত্রণাদায়ক ছবি। বর্তমান সময়ে গোটা দেশজুড়ে প্রগতিশীল শিল্প, সংস্কৃতি ও স্বাধীন চিন্তার ওপর যে ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত আক্রমণ নেমে আসছে, তার বিরুদ্ধে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
উপস্থিত সাংস্কৃতিক কর্মী ও লেখকদের স্পষ্ট বক্তব্য—আজ যখন সত্যকে চেপে রাখার চেষ্টা চলছে, যখন মুক্তচিন্তার স্বরকে স্তব্ধ করতে চাইছে কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, তখন প্রেমচাঁদ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। 'গোদান'-এর হরি কিংবা 'কফন'-এর ঘিসু-মাধবদের যে সামাজিক বাস্তবতা প্রেমচাঁদ এঁকেছিলেন, তা আজও ভিন্ন রূপে বর্তমান।
লড়াইয়ের শপথ নিয়ে প্রভাতের সূচনা
আজকের এই প্রভাতী কর্মসূচী কেবল এক আনুষ্ঠানিক মাল্যদানে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা পরিণত হয়েছিল এক সাংস্কৃতিক শপথে। দুর্গাপুরের মাটি থেকে সুর উঠল—যতই আক্রমণ আসুক না কেন, প্রগতিশীল চিন্তা, সত্য প্রকাশ এবং প্রগতির পতাকাকে কোনো অবস্থাতেই নামতে দেওয়া হবে না।
শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলের উপস্থিতিতে আজকের সকালের ট্রাঙ্ক রোড রোটারী যেন হয়ে উঠেছিল প্রগতিশীল সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক লড়াইয়ের এক অনুপ্রেরণামূলক মিলনক্ষেত্র।


.jpeg)

