নয়াদিল্লি: দেশের নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের দাবি করে কেন্দ্র সরকার বারবার বিরোধীদের সমালোচনাকে "দেশবিরোধী" বলে আক্রমণ করেছে। কিন্তু ভারতের বৃহত্তম পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র কুদানকুলাম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট-সংক্রান্ত হাজার হাজার সংবেদনশীল নথি ডার্ক ওয়েবে প্রকাশ্যে চলে আসার ঘটনায় সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই এবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, র্যানসমওয়্যার গোষ্ঠী World Leaks ডার্ক ওয়েবে প্রায় ১৯ হাজার সংবেদনশীল নথি প্রকাশ করেছে, যা কুদানকুলাম প্রকল্পের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও তদন্ত এখনও চলছে, তবুও এই ঘটনা ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার সুরক্ষা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ফাঁস হওয়া নথিতে ইউনিট–৩ ও ৪-এর ভেন্টিলেশন ও কুলিং সিস্টেমের নকশা, কন্ট্রোল রুমের ফ্লোর প্ল্যান, সরবরাহকারী সংস্থার তালিকা, পরিদর্শন রিপোর্ট, বৈঠকের কার্যবিবরণী এবং বিমা সংক্রান্ত তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের তথ্য শত্রুপক্ষ বা সাইবার অপরাধীদের হাতে পৌঁছালে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ঘটনার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে—যদি এত গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু প্রকল্পের তথ্য সুরক্ষিত রাখা না যায়, তবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের দাবির বাস্তবতা কতটা?
সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, দেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত, সেনা বা গোয়েন্দা ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তুললেই বহু ক্ষেত্রে বিরোধী কণ্ঠকে "দেশবিরোধী" বা "অ্যান্টি-ন্যাশনাল" বলে আক্রমণ করা হয়। তাঁদের বক্তব্য, নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যর্থতা নিয়ে জবাবদিহি চাওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ; প্রশ্ন তোলাকে দেশবিরোধী আখ্যা দিলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হয় না। অন্যদিকে, সরকারের সমর্থকদের বক্তব্য, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে দায়িত্বশীল আলোচনা হওয়া উচিত এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, তথ্য ফাঁসের উৎস হতে পারে রিলায়েন্স গ্রুপ-সংক্রান্ত একটি সার্ভার, যা Yotta Infrastructure-এর ডেটা সেন্টারে হোস্ট করা ছিল। Yotta জানিয়েছে, ২৯ মে সন্দেহজনক কার্যকলাপ ধরা পড়ার পর সংশ্লিষ্ট সার্ভার বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পরে রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার জানায়, একটি বাহ্যিক হুমকিদাতা ডেটা ফাঁসের দাবি করেছে এবং বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে।
ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ সংস্থা NPCIL বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। পাশাপাশি CERT-In ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, কুদানকুলাম প্রকল্পে এর আগেও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০১৯ সালে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ থাকা Lazarus গোষ্ঠীর ম্যালওয়্যার প্রশাসনিক নেটওয়ার্কে শনাক্ত হয়েছিল। তখন NPCIL জানিয়েছিল, মূল রিঅ্যাক্টর পরিচালনা ব্যবস্থা অক্ষত ছিল।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল যে শুধু সামরিক শক্তি বা রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তাও জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের তথ্য সুরক্ষিত রাখতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের মধ্যে আরও কঠোর সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ জবাবদিহির প্রয়োজন রয়েছে।


