শংকর পাল
বিশেষ প্রতিবেদন
ভারতীয় সাহিত্য ও ইতিহাসের জগতে 'মহামহোপাধ্যায়' বা 'মহাপণ্ডিত' হিসেবে পরিচিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন (১৮৯৩–১৯৬৩) এক অসামান্য প্রতিভা। প্রায় ৩০টি ভাষায় পারদর্শী এই মানুষটি আজ থেকে ৬০ বছর আগে চলে গেলেও, বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁর চিন্তাধারা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তবে, তাঁর প্রগতিশীল দর্শন এবং মার্কসবাদী আদর্শের কারণে সমসাময়িক কট্টরপন্থী বা দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছে তিনি প্রায়শই সমালোচনার শিকার হন। কেন তিনি আজও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে? কেন দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি তাঁর মতাদর্শকে ভিন্ন চোখে দেখে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তাঁর জীবন ও দর্শনকে নতুন করে বিশ্লেষণ করতে হবে।
কে এই রাহুল সাংকৃত্যায়ন?
রাহুল সাংকৃত্যায়ন ছিলেন একাধারে ইতিহাসবিদ, ভাষাবিদ, ভ্রমণকারী এবং সমাজসংস্কারক। আজমগড়ে জন্ম নেওয়া কেদারনাথ পাণ্ডেই পরবর্তীতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও মার্কসবাদী চিন্তাবিদ রাহুল সাংকৃত্যায়ন হয়ে ওঠেন। তাঁর লেখা দেড়শতাধিক বইয়ের মধ্যে 'ভোলগা থেকে গঙ্গা' আজও বিশ্বসাহিত্যের একটি মাইলফলক, যা মানব সমাজের বিবর্তনকে সহজ অথচ গভীর ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছে। তিব্বততত্ত্ব, কেন্দ্রীয় এশিয়ার ইতিহাস এবং বৌদ্ধ দর্শন নিয়ে তাঁর গবেষণামূলক কাজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
কেন দক্ষিণপন্থী শক্তির নিশানায় রাহুল?
রাহুল সাংকৃত্যায়নের সাথে তথাকথিত দক্ষিণপন্থী বা কট্টর ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর সংঘাত মূলত আদর্শগত। তাঁর চিন্তাধারার কয়েকটি মূল দিক দক্ষিণপন্থী দর্শনের পরিপন্থী:
ধর্ম ও রামরাজ্যের বিরোধিতা: রাহুল সাংকৃত্যায়ন মনে করতেন, ধর্মকে অনেক সময় শাসকশ্রেণী শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তৎকালীন সময়ে যখন কট্টরপন্থী নেতারা 'রামরাজ্য'-এর আদর্শ প্রচার করছিলেন, রাহুল তখন তার কঠোর সমালোচনা করে লিখেছিলেন 'রামরাজ্য ও মার্কসবাদ'। তিনি রামরাজ্যকে বর্ণবাদী ও সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর রক্ষাকবচ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
বর্ণবাদ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াই: তিনি জাতপাত ও বর্ণপ্রথাকে ভারতের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় মনে করতেন। অন্যদিকে, দক্ষিণপন্থী রাজনীতির একটি বড় অংশ ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে এই বর্ণভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থাকে জিইয়ে রাখতে চায়। ফলে, রাহুলের 'বর্ণপ্রথা বিনাশের' ডাক তাদের জন্য অস্বস্তিকর ছিল।
সাম্প্রদায়িকতার বদলে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ: রাহুল সাংকৃত্যায়ন চেয়েছিলেন এক বৈচিত্র্যময় ভারত, যেখানে ধর্ম পরিচয় নয়, বরং শ্রেণি ও সামাজিক সাম্যই হবে প্রধান ঐক্য। বর্তমানের 'সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ' বা 'হিন্দুবাদী' বয়ানের বিপরীতে তাঁর এই ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শিবিরের কাছে আক্রমণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কেন দক্ষিণপন্থী শক্তি তাঁর মতাদর্শকে 'মলিন' করতে চায়?
বর্তমান সময়ে যখন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ইতিহাসকে নতুন করে লেখার চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতো যুক্তিবাদী এবং প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের মতাদর্শ একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. ইতিহাসের পুনর্লিখন: দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলো ভারতকে একটি অভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করতে চায়। রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর গবেষণায় প্রমাণ করেছিলেন যে, ভারত সবসময়ই মিশ্র সংস্কৃতির দেশ। তাঁর এই ঐতিহাসিক সত্য তাদের 'এক ধর্ম, এক সংস্কৃতি' প্রকল্পের সাথে সাংঘর্ষিক।
২. নাস্তিকতা ও যুক্তিবাদ: একজন মার্কসবাদী হিসেবে রাহুল সাংকৃত্যায়ন সরাসরি ঈশ্বর ও ধর্মতত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। যে রাজনীতি ধর্মের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে রাহুলের মতো যুক্তিবাদী ব্যক্তিত্বের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই তাদের আধিপত্যের পতন।
রাহুল সাংকৃত্যায়ন কোনো সংকীর্ণ রাজনৈতিক বৃত্তে নিজেকে আটকে রাখেননি। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ কুসংস্কার ও শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসুক। তাঁর বিরোধীরা হয়তো তাঁকে মুছে ফেলার বা হেয় করার চেষ্টা করবে, কিন্তু 'ভোলগা থেকে গঙ্গা' বা 'মধ্য এশিয়ার ইতিহাস'-এর মতো কাজগুলো প্রমাণ করে দেয় যে, সত্যের ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের ধার ধারে না।
দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও লেখক রাহুল সাংকৃত্যায়নকে নিয়ে লেখা। আধুনিক তেলেগু চলচ্চিত্র পরিচালক রাহুল সাংকৃত্যায়নের (যিনি 'শ্যাম সিংহ রায়' সিনেমার জন্য পরিচিত) সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই এবং এটি কোনোভাবেই বিভ্রান্তিকর নয়।
আশা করি এই প্রতিবেদনটি আপনার গবেষণার কাজে আসবে। আপনি যদি রাহুল সাংকৃত্যায়নের কোনো নির্দিষ্ট বই বা তাঁর মার্কসবাদী দর্শন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত আলোচনা চান, তবে আমাকে জানাতে পারেন।


