ইন্দোনেশিয়ার অশান্ত পাপুয়া অঞ্চলে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে চরম বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা। 'বাকুসিপ' (Bakusip) নামের একটি নতুন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী পাপুয়া পেগুনুনগান প্রদেশের ইয়াহুকিমোতে মার্কিন পাইলট নিকোলাস এফ. গোসলিনকে (Nicholas F. Goselin) হত্যা এবং তার বেসামরিক বিমান পুড়িয়ে দেওয়ার দায় স্বীকার করেছে।
২ থেকে ৩ জুলাই, ২০২৬-এর মধ্যে ঘটা এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ইন্দোনেশীয় বাহিনী এবং পশ্চিম পাপুয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতপূর্ণ এই অঞ্চলে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হামলা: ঠিক কী ঘটেছিল?
২৯ বছর বয়সী নিকোলাস এফ. গোসলিন 'পিটি অ্যাসোসিয়েটেড মিশন এভিয়েশন' (PT Associated Mission Aviation) পরিচালিত একটি পিলাটাস বিমানের (নিবন্ধন PK-RCY) ক্যাপ্টেন ছিলেন। ইয়াহুকিমোর সোবাহাম জেলার বালিংগামা এয়ারস্ট্রিপে বিমানটি ধ্বংস করা হয়। অভিযোগ, বিদ্রোহী যোদ্ধারা বিমানটিতে গুলি চালায়, পাইলটকে হত্যা করে এবং ধ্বংসাবশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ইন্দোনেশিয়ার 'অপারেশন কার্টেঞ্জ ২০২৬'-এর আইন প্রয়োগকারী টাস্ক ফোর্স (Satgas Gakkum ODC) পরে নিশ্চিত করে যে, হামলাকারীরা সদ্য গঠিত সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠী (KKB) 'বাকুসিপ'-এর সদস্য। এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছে এম. এমবালিংগা (M. Mbalingga), যার সাথে ইয়াহুকিমোতে এলকিয়াস কোবাকের (Elkius Kobak) নেতৃত্বাধীন যোদ্ধাদের সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিবৃতিতে বাকুসিপ এই হামলার দায় স্বীকার করে একে ওই অঞ্চলে ইন্দোনেশিয়ার নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে তাদের বৃহত্তর প্রতিরোধের অংশ হিসেবে দাবি করেছে।
কে এই বাকুসিপ?
ঐতিহ্যবাহী OPM (অর্গানিসাসি পাপুয়া মেরদেকা) বা TPNPB-এর মতো পুরোনো সংগঠনের পরিবর্তে বাকুসিপ একটি সম্পূর্ণ নতুন উপদল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা সূত্র অনুযায়ী:
এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছে এম. এমবালিংগা।
এরা মূলত ইয়াহুকিমো এবং আশেপাশের উচ্চভূমি অঞ্চলে সক্রিয়।
স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা এলকিয়াস কোবাকের নেটওয়ার্কের সাথে এদের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
বাকুসিপের ইতিহাস সম্পর্কে বিশদ তথ্য সীমিত হলেও, ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই গোষ্ঠীটি আগে থেকেই তাদের কথিত নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে বিমান চলাচলে হুমকি দিয়ে আসছিল। ফলে এই হামলাকে পুরোপুরি আকস্মিক বলে মনে করা হচ্ছে না।
বিদ্রোহীদের দাবি কী?
এই নির্দিষ্ট হামলার বিষয়ে বাকুসিপ বিস্তারিত কোনো বিবৃতি না দিলেও, বৃহত্তর পশ্চিম পাপুয়া বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের দীর্ঘস্থায়ী দাবিগুলোর সাথেই তারা সরাসরি যুক্ত:
স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ: তাদের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো ইন্দোনেশিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি স্বাধীন পশ্চিম পাপুয়া রাষ্ট্র গঠন এবং পূর্ব তিমুরের মতো একটি 'প্রকৃত গণভোট' আয়োজন করা।
শান্তি আলোচনা: ইন্দোনেশিয়া সরকারের সাথে আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আলোচনা শুরু করা।
আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ: তারা চায় জাতিসংঘ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মতো আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো এই সংঘাত নিরসনে হস্তক্ষেপ করুক এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করুক।
বিদেশি সামরিক সহায়তা বন্ধ: ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী ও পুলিশকে সামরিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া থেকে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোকে বিরত রাখা।
মানবাধিকার ও সম্পদের অধিকার: ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা এবং স্থানীয় আদিবাসীদের অধিকার ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার ফলে বহুমুখী প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে:
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক পদক্ষেপ: সংঘাতপূর্ণ এলাকায় মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং পাইলটের মৃত্যুর বিষয়ে ওয়াশিংটন বিস্তারিত তথ্যের জন্য চাপ দিচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার কড়া অবস্থান: ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ এই হামলাকে কেকেবি-র অপরাধমূলক কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং বাকুসিপ ও এর নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মিডিয়া কভারেজ: মূলধারার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই খবর গুরুত্ব পেয়েছে এবং সামাজিক মাধ্যমে বিদ্রোহীদের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
নিকোলাস এফ. গোসলিনকে হত্যার ঘটনাটি একটি কঠোর বার্তা দেয় যে পাপুয়া সংঘাত এখনও অমীমাংসিত এবং কিছু এলাকায় এটি আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। বাকুসিপের মতো নতুন দলগুলোর উত্থানের ফলে এই অঞ্চলে কর্মরত বিদেশি বিমানচালক, মিশনারি এবং ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পশ্চিম পাপুয়াকে কেন্দ্র করে চলা কয়েক দশকের এই স্বাধীনতা সংগ্রাম কীভাবে একটি আঞ্চলিক সমস্যা থেকে দ্রুত বৈশ্বিক কূটনৈতিক ও মানবাধিকার সংকটে পরিণত হতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।





