" " //psuftoum.com/4/5191039 Live Web Directory ফ্যাসিবাদের আগ্রাসন ও বাংলার সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ | কোচবিহারে 'যুবশক্তি'র ৫৯তম বর্ষে পলাশ দাশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ //whairtoa.com/4/5181814
Type Here to Get Search Results !

ফ্যাসিবাদের আগ্রাসন ও বাংলার সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ | কোচবিহারে 'যুবশক্তি'র ৫৯তম বর্ষে পলাশ দাশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

 



বিশেষ সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ: কোচবিহারে 'যুবশক্তি' পত্রিকার ৫৯তম বর্ষের আলোচনা সভায় যুবনেতা পলাশ দাশের বক্তব্যের আলোকে সমকালীন রাজনীতি, সামাজিক বৈপরীত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের এক বস্তুনিষ্ঠ বিনির্মাণ।



 প্রারম্ভিক প্রেক্ষাপট: কোচবিহারে ‘যুবশক্তি’ পত্রিকার সভার প্রাসঙ্গিকতা


বর্তমান ভারতের টালমাটাল রাজনৈতিক আবহে কোচবিহারে আয়োজিত ‘যুবশক্তি’ পত্রিকার ৫৯তম বর্ষের সভাটি কেবল একটি প্রথাগত দলীয় কর্মসূচি নয়, বরং এটি সমকালীন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটি বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক ‘কাউন্টার-হেজেমনি’ (Counter-hegemony) তৈরির ক্ষেত্র। উত্তরবঙ্গের এই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

পলাশ দাসের বক্তব্যে একটি গভীর রাজনৈতিক ‘প্যারাডক্স’ (Paradox) বা বৈপরীত্য উঠে এসেছে:

  • নির্বাচনী বৈপরীত্য: ২০২৪-এর নির্বাচনে যখন সারা দেশজুড়ে বিজেপি এসসি ($SC$) ও এসটি ($ST$) সংরক্ষিত আসনগুলোতে বড় ধাক্কা খেয়েছে (৬৫টির মধ্যে ৬২টিতেই তারা পরাস্ত), তখন বাংলার উত্তরভাগে এই নিম্নবর্গের মানুষের একটি বড় অংশ কেন হিন্দুত্বের প্রকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ল?

  • সমাজতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ: এই সমাজতাত্ত্বিক জিজ্ঞাসাটিই বর্তমান সময়ের সবথেকে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।

কোচবিহারের এই আলোচনা সভা তাই নিছক একটি ভাষণ নয়, বরং বাংলার প্রগতিশীল রাজনীতির আত্মসমীক্ষা এবং ফ্যাসিবাদের চারিত্রিক বিবর্তনের এক বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা।



নয়া-ফ্যাসিবাদ: চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ‘বিগ লাই’-এর প্রোপাগান্ডা


নয়া-ফ্যাসিবাদ কেবল উগ্র জাতীয়তাবাদের উন্মাদনা নয়; এটি একটি পরিকল্পিত ‘তাত্ত্বিক নির্মাণ’ যা ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। হিটলারের জার্মানি বা মুসোলিনির ইতালির মতোই আজকের ভারতীয় প্রেক্ষাপটে ‘বিগ লাই’ (Big Lie) বা প্রকণ্ড মিথ্যার প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। নোটবন্দি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন—সবক্ষেত্রেই একটি মিথ্যা বয়ানকে ক্রমাগত প্রচারের মাধ্যমে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে।

  • অন্যকরণ (Otherization) ও কল্পিত শত্রু: ফ্যাসিবাদ সবসময়ই একটি ‘অন্য’ বা ‘শত্রুপক্ষ’ তৈরি করে। সোনম ওয়াংচুকের মতো পরিবেশ ও অধিকার রক্ষাকারীকে যখন ‘চীনা এজেন্ট’ বা ‘বিদেশি অর্থপুষ্ট’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হবে এটি ফ্যাসিবাদের চিরন্তন কৌশল।

  • মিলিটারাইজেশন ও অননুমোদিত বাহিনী: যন্তর-মন্তরের আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের পোশাক পরা এক ‘অননুমোদিত’ বাহিনীর নিদারুণ দমনপীড়ন হিটলারের এস.এস ($SS$) বাহিনীর কথা মনে করিয়ে দেয়।

  • ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ: ‘এক দেশ, এক ভাষা, এক প্রধান’—এই দর্শনের আড়ালে সংসদীয় গণতন্ত্রের অবক্ষয় ঘটানো হচ্ছে, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশকেই ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়া হয়।

প্রাসঙ্গিকতা (So What?): এই ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণ সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অস্তিত্বের ওপর এক চরম ঝুঁকি। যখন রাষ্ট্র মানুষের আহার, পরিধান এবং ব্যক্তিগত ধর্মচর্চাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ধূলিসাৎ হয়। হিটলারের শেষ হয়েছিল বাংকারে এবং মুসোলিনির ল্যাম্পপোস্টে—ইতিহাসের এই অমোঘ শিক্ষা বর্তমান স্বৈরাচারী শক্তির জন্যও সমান সত্য।



 ইতিহাস বিকৃতি ও বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বিনাশ


ফ্যাসিবাদ সত্য ইতিহাসকে ভয় পায় বলেই তার প্রধান আক্রমণ থাকে সংস্কৃতির ওপর। রবীন্দ্রনাথের ‘ভারততীর্থ’ কবিতায় যে ‘মহামানবের সাগর’-এর কথা বলা হয়েছে, আরএসএস-বিজেপির ‘হিন্দুত্ব’ প্রকল্প তার ঠিক বিপরীত—এটি মূলত একটি ব্রাহ্মণ্যবাদী ও পুরুষতান্ত্রিক অবকাঠামো।


সংস্কৃতির আধিপত্যবাদ ও মনীষীদের বর্জন


১. বর্জন ও বিকৃতি: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহরু এবং ভগত সিংয়ের বৈচিত্র্যময় ও অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসকে আড়াল করে একটি একক ভাবধারা চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে।

২. রেনেসাঁ ও আধুনিকতার সংঘাত: তারা রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের যুক্তিবাদ ও আধুনিকতাকে পছন্দ করে না, কারণ তা ফ্যাসিবাদের অন্ধবিশ্বাসের রাজনীতির প্রধান অন্তরায়।

৩. ভাষাগত আধিপত্য: ‘এক ভাষা’ নীতির মাধ্যমে হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দিয়ে বাংলা বা তামিলের মতো ধ্রুপদী সংস্কৃতিকে বিলুপ্ত করার যে ‘লিঙ্গুইস্টিক হেজেমনি’ তৈরি করা হচ্ছে, তা বাংলার আত্মপরিচয়ের জন্য ঘোরতর বিপদ।

প্রাসঙ্গিকতা (So What?): ইতিহাস ও মনীষীদের এই পরিকল্পিত বিকৃতি আগামী প্রজন্মের মনস্তত্ত্বকে বিষিয়ে দেবে। রবীন্দ্রনাথের দর্শনের সেই ‘ভারত’—যেখানে আর্য, অনার্য, পাঠান, মোগল এক দেহে লীন হয়েছিল—তাকে মুছে ফেলার অর্থ হলো ভারতের আত্মিক ভিত্তিটিই উপড়ে ফেলা।


শিক্ষা ও শাসনব্যবস্থার সংকট: যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ‘নির্মম দখলদারিত্ব’


শিক্ষা ও প্রশাসনের ওপর আঘাত নিছক কোনো প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি ফ্যাসিবাদের একটি কৌশলগত দখলদারিত্ব। নিট ($NEET$) কেলেঙ্কারি বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলি শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর কর্পোরেট ও দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জ্বলন্ত উদাহরণ।

  • তৃণমূল স্তরের গণতন্ত্র ধ্বংস: ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের নামে পঞ্চায়েত ও পৌরসভার আর্থিক ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে। এমনকি জন্ম-মৃত্যুর প্রশংসাপত্র দেওয়ার মতো ক্ষুদ্র প্রশাসনিক ক্ষমতাগুলোও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর সরাসরি আক্রমণ।

  • প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ: এই প্রশাসনিক স্বৈরাচারের ফলশ্রুতিতে দেশে দলিতদের ওপর অত্যাচার ২৮% এবং আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার ৫৭% বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, ফ্যাসিবাদী শাসন সবসময়ই নিম্নবর্গের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা কেড়ে নেয়।


 প্রতিরোধে ‘জেন জি’ (Gen Z) ও ‘মহামানবের সাগর’


এত হতাশার মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছে নতুন প্রজন্ম—জেন জি (Gen Z)। এনসিআরটি ($NCERT$) পাঠ্যবই থেকে এক কিশোরীর ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ বা সরকারের দায়বদ্ধতার সংজ্ঞা পড়ে শোনানোর দৃশ্যটিই বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতীক।

বাংলার সাম্প্রতিক গণআন্দোলনে কৃষক আন্দোলন, দিল্লির ছাত্র আন্দোলন এবং শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই আজ কর্পোরেট-ফ্যাসিবাদী আঁতাতের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রতিরোধের কৌশলগত রূপরেখা

ফ্যাসিবাদী বিভাজন কৌশলশ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ধরন
‘অন্যকরণ’ (Otherization): ধর্মীয় ও সামাজিক বিভেদ সৃষ্টি।শিখ-মুসলিম-হিন্দু-দলিত সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা লঙ্গরখানা ও সামাজিক সংহতি।
ভাষাগত আধিপত্যবাদ: এক ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।বাংলা, তামিল ও অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার স্বাধিকার ও সাংস্কৃতিক গৌরব পুনরুদ্ধারের লড়াই।
কর্পোরেট শোষণে সহায়তা: কর্পোরেট পুঁজির একচেটিয়া মুনাফা।সুইগি-জোম্যাটোর মতো গিগ ($Gig$) শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অধিকার রক্ষা আন্দোলন।
মেধা ও শিক্ষা ধ্বংস: প্রশ্নপত্র ফাঁস ও $NEET$ কেলেঙ্কারি।ছাত্র-যুবদের রাজপথ দখল এবং প্রশাসনের 'Accountability' বা দায়বদ্ধতার দাবি।

প্রাসঙ্গিকতা (So What?): এই প্রজন্মের লড়াই কেবল রাজপথের উত্তাপ নয়, এটি কর্পোরেট পুঁজিনির্ভর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক গভীর বৌদ্ধিক সংগ্রাম। জেন জি-র এই সাহস কর্পোরেট-নির্ভর সেবাদাস শাসনের জন্য এক চরম দুঃসংবাদ।


 জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াই ও ‘যুবশক্তি’-র বৌদ্ধিক দায়বদ্ধতা


ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত জয় কেবল স্লোগানে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী জ্ঞানতাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি। পলাশ দাসের বক্তব্যের মূল বার্তা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে গেলে কেবল আবেগ নয়, বরং অর্থনীতি, ইতিহাস এবং মার্ক্সবাদী তত্ত্বের গভীর পাঠ অপরিহার্য।


রবীন্দ্রনাথ একসময় ফ্যাসিবাদের প্রকৃত রূপ চিনতে রোম্যাঁ রোলাঁর দ্বারস্থ হয়েছিলেন। আজকেও সেই একই জ্ঞানের আলো প্রয়োজন। ‘যুবশক্তি’ পত্রিকার মতো মুখপত্র এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বামপন্থী লড়াইয়ের বিস্তার কেন জরুরি, তা এই সময়ের সংকট থেকেই স্পষ্ট। অন্ধ আবেগ নয়, বরং তাত্ত্বিক চেতনার মাধ্যমেই ফ্যাসিবাদের বিষদাঁত ভাঙা সম্ভব। ভয়কে জয় করে, বৈচিত্র্যকে আলিঙ্গন করে এবং শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যের মাধ্যমেই এক সুন্দর ও গণতান্ত্রিক সমাজের সূচনা হবে।

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies