১. আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি
গুরুগ্রামের রাজপথ সম্প্রতি যে গণবিক্ষোভ প্রত্যক্ষ করেছে, তা কেবল একটি শ্রমবিরোধ নয়, বরং হরিয়ানার শ্রম সম্পর্কের ইতিহাসে এক চূড়ান্ত সংকটের প্রতিফলন। সিভিল লাইন্স এলাকায় পরিবেশ, বন ও বন্যপ্রাণী মন্ত্রী রাও নরবীর সিং-এর বাসভবন ঘেরাও করার এই কর্মসূচিটি রাষ্ট্রের ‘চুক্তিভিত্তিক শোষণ’ মডেলের বিরুদ্ধে এক সাহসী সম্মুখ সমর। যখন প্রকৃতির পাহারাদাররাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হন, তখন তা বর্তমান প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অন্তঃসারশূন্যতাকেই প্রকট করে তোলে।
'ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন, হরিয়ানা (CITU)'-এর পতাকাতলে কয়েক হাজার শ্রমিক কমলা নেহেরু পার্ক থেকে যখন পদযাত্রা শুরু করেন, তখন তাদের নেতৃত্বে ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাজকুমার সোলাঙ্কি এবং সভাপতি বিজয় কুমার। গুরুগ্রামের রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলা সেই শ্রমিকদের স্লোগান কেবল দাবি আদায়ের ডাক ছিল না, বরং তা ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। পুলিশি ব্যারিকেড দিয়ে এই স্বতঃস্ফূর্ত জনস্রোতকে থামানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে; শ্রমিকরা মন্ত্রীর বাসভবনের সামনেই 'শান্তিপূর্ণ অবস্থান ধর্মঘটে' বসে পড়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁরা আর ফাঁকা প্রতিশ্রুতিতে ভুলবেন না। এই আন্দোলন সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে সরকারের সেই নীতিকে, যেখানে স্থায়ী পদের পরিবর্তে ঠিকাদারি প্রথাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে চলা এই বঞ্চনাই আজ এক সুসংগঠিত বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে।
২. বঞ্চনার ঐতিহাসিক সময়রেখা: প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের দুই দশক
হরিয়ানার বন কর্মীদের বর্তমান দুর্গতির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিকল্পিত এক 'প্রাতিষ্ঠানিক শোষণ' (Institutionalized Exploitation)। গত বিশ বছরে নীতিগত পরিবর্তনের আড়ালে কীভাবে কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা নিচের সারণিতে স্পষ্ট:
সময়কাল | মূল ঘটনা ও পরিবর্তনের চিত্র |
১৯৯০-২০০৫ | সরাসরি সরকারি তত্ত্বাবধানে 'মাস্টার রোল' হাজিরা ব্যবস্থার মাধ্যমে বেতন প্রদান। শ্রমিকদের মধ্যে কিছুটা স্থায়িত্ব ছিল। |
২০০৮ | সংকটের সূত্রপাত: মাস্টার রোল ব্যবস্থা বাতিল করে ঠিকাদার-নির্ভর বিলিং পদ্ধতি চালু। সরকারি তহবিল মধ্যস্বত্বভোগীদের কবলে চলে যায়। |
২০১৭ | তীব্র আন্দোলনের মুখে ESI ও EPF সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিলেও সরকার তা বাস্তবায়নে চরম অনীহা দেখায়। |
২০২০-২০২৩ | CITU-এর নেতৃত্বে একাধিকবার স্মারকলিপি প্রদান ও বিক্ষোভ সত্ত্বেও প্রশাসনের মৌনতা বজায় থাকে। |
২০২৪-২০২৫ | সরকারি নার্সারি বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু এবং বকেয়া মজুরি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া। |
বর্তমান | মন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও এবং দাবি পূরণ না হলে রাজ্যব্যাপী ধর্মঘটের চূড়ান্ত আল্টিমেটাম। |
এই পরিক্রমা প্রমাণ করে যে, ২০০৮ সালের সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্তই ছিল শ্রমিকদের দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দেওয়ার প্রধান চাবিকাঠি। সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে বেতন প্রদানের পরিবর্তে ঠিকাদারি প্রথা চালু করার ফলে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যাচ্ছে, অথচ যে কর্মীরা রোদে পুড়ে-বৃষ্টিতে ভিজে বন রক্ষা করছেন, তাঁদের ভাগ্যে জুটছে কেবল অনিশ্চয়তা। এই ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতাই আজকের শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান জ্বালানি।
৩. দাবিসমূহ ও শ্রমিকদের জীবনমান: বাঁচার লড়াই
দিল্লি-এনসিআর-এর মতো আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়ের এলাকায় মাসে মাত্র ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা মজুরি পাওয়া এক নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ যেখানে ন্যূনতম জীবনধারণের জন্য একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে, সেখানে এই ‘দরিদ্র মজুরি’ (Poverty Wage) দিয়ে পরিবার চালানো অসম্ভব। তাই শ্রমিকদের ২৬,০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি এবং সামাজিক সুরক্ষার দাবি আজ কেবল আর্থিক দাবি নয়, বরং মানুষের মতো বেঁচে থাকার লড়াই।
ইউনিয়নের প্রধান দাবিসমূহ:
- চাকরি স্থায়ীকরণ: দীর্ঘ এক বা দুই দশক ধরে কর্মরত অস্থায়ী কর্মীদের অবিলম্বে স্থায়ী পদে নিয়োগ দেওয়া।
- ২৬,০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি: বর্তমান বাজারদর ও দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মাসিক বেতন পুনঃনির্ধারণ।
- মাস্টার রোল পুনঃস্থাপন: দুর্নীতির আখড়া ‘ঠিকাদার প্রথা’ বিলুপ্ত করে সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে বেতন নিশ্চিত করা।
- ESI ও EPF সুবিধা: ২০১৭ সালের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে স্বাস্থ্য বীমা এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
- লেবার ওয়েলফেয়ার বোর্ডে নাম নথিভুক্তকরণ: শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের আওতায় এনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সহায়তার সুবিধা প্রদান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ২৬,০০০ টাকার দাবি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর না করলে বন বিভাগের কর্মদক্ষতা তো কমবেই, সাথে সাথে কয়েক হাজার পরিবার চূড়ান্ত দারিদ্র্যের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
৪. বিভাগীয় সংকোচন ও পরিবেশগত জরুরি অবস্থা
শ্রমিক অধিকার হরণ এবং পরিবেশ ধ্বংস—এই দুটি বিষয় হরিয়ানায় এখন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে হরিয়ানার বনাচ্ছাদন মাত্র ৩.৯ শতাংশ, যা ভারতের যে কোনো রাজ্যের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে কম। এই ভয়াবহ ‘পরিবেশগত জরুরি অবস্থা’র (Environmental Emergency) মাঝেও সরকার একের পর এক সরকারি নার্সারি বন্ধ করে দিয়ে কাজগুলো বেসরকারি ঠিকাদারদের হাতে তুলে দিচ্ছে।
ইউনিয়ন নেতা রাজকুমার সোলাঙ্কির অভিযোগ, সরকারি নার্সারি বন্ধ করার এই চক্রান্ত মূলত একটি বৃহত্তর বেসরকারীকরণ এজেন্ডার অংশ। প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ বন কর্মীদের উপেক্ষা করে অদক্ষ ঠিকাদারি শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর ফলে বনায়ন কর্মসূচি ব্যর্থ হচ্ছে। দক্ষ কর্মীবাহিনীর অনিশ্চয়তা সরাসরি রাজ্যের পরিবেশগত নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। পরিবেশ রক্ষা যাদের কাজ, তাঁদের জীবনকেই যদি অনিরাপদ করে রাখা হয়, তবে হরিয়ানার সবুজায়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
৫. আইনি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিকভাবে হরিয়ানার বিজেপি সরকার এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। একদিকে CITU-এর মতো শক্তিশালী বামপন্থী সংগঠনের নেতৃত্বাধীন শ্রমিক আন্দোলন, অন্যদিকে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনের চাপ—সরকারকে দিশেহারা করে তুলেছে। আইনি দিক থেকে বিচার করলে, সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক 'উমা দেবী' রায়টি এখানে একটি দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো কাজ করছে। যদিও এই রায় চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের সরাসরি স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে কিছু আইনি বাধা তৈরি করেছে, কিন্তু একই সাথে এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দীর্ঘদিনের কর্মীদের ‘সমান কাজে সমান বেতন’ এবং মানবিক মর্যাদা প্রদান করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা।
অন্যান্য রাজ্যের সাথে তুলনামূলক চিত্র:
- কেরালা: এখানে মজুরি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয় এবং KIRTADS-এর মতো মডেলের মাধ্যমে আদিবাসী ও বন কর্মীদের বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়।
- হিমাচল প্রদেশ: বন কর্মীদের একটি বিশাল অংশকে নিয়মিত বেতনের আওতায় এনে পেশাগত নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে।
- হরিয়ানা: ঠিকাদারদের তোষণ করতে গিয়ে এখানে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমিকদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। শ্রমিক অধিকার বনাম সরকারের করপোরেট-বান্ধব নীতির এই সংঘাত এখন হরিয়ানার রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রে।
৬. উপসংহার: ১৫ দিনের আল্টিমেটাম ও আগামীর পথ
হরিয়ানার বন কর্মীদের দেওয়া ১৫ দিনের আল্টিমেটামটি এখন একটি ‘টিকিং টাইম বোমা’র মতো কাজ করছে। এটি কেবল কয়েক হাজার শ্রমিকের দাবি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের বিবেকের কাছে একটি প্রশ্ন। রাজকুমার সোলাঙ্কি ও বিজয় কুমারের নেতৃত্বে শ্রমিকরা যে শপথ নিয়েছেন, তা স্পষ্ট করে দেয় যে এবার তাঁরা চূড়ান্ত ফয়সালা না নিয়ে মাঠ ছাড়বেন না।
ভবিষ্যৎ পরিণতির রূপরেখা: ১. সরকার নির্ধারিত ১৫ দিনের মধ্যে সম্মানজনক সমাধানে না পৌঁছালে রাজ্যব্যাপী অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু হবে। ২. দাবি আদায়ে শ্রম আদালতে ‘উমা দেবী’ রায়ের মানবিক দিকগুলোকে ঢাল করে আইনি লড়াই শুরু। ৩. জাতীয় পর্যায়ে CITU-এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর সংসদীয় চাপ তৈরি করা।
পরিশেষে, এই আন্দোলনের পরিণতিই নির্ধারণ করবে হরিয়ানায় শ্রমের মর্যাদা থাকবে নাকি ঠিকাদারি শোষণের জয় হবে। যে কর্মীরা রাজ্যের সবুজায়নের কাণ্ডারি, তাঁদের জীবনকে অন্ধকারে রেখে হরিয়ানাকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে দাবি করা কেবল এক অলীক কল্পনা। সরকার যদি দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে গুরুগ্রামের এই স্ফুলিঙ্গ সমগ্র হরিয়ানায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র।


