" " //psuftoum.com/4/5191039 Live Web Directory মঞ্চের বিদ্রোহী কণ্ঠ আজ নীরব, কিন্তু তাঁর নাটক এখনও কথা বলে //whairtoa.com/4/5181814
Type Here to Get Search Results !

মঞ্চের বিদ্রোহী কণ্ঠ আজ নীরব, কিন্তু তাঁর নাটক এখনও কথা বলে

 



উৎপল দত্তের ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

কলকাতা, ১৯ আগস্ট ২০২৬:
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠস্বর কখনও থামে না। কিছু শিল্পী পর্দার আড়ালে হারিয়ে যান, কিন্তু তাঁদের শিল্প সময়ের বুকের ওপর রেখে যায় অমোচনীয় দাগ। উৎপল দত্ত তেমনই এক নাম।

আজ, ১৯ আগস্ট, তাঁর ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৩ সালের এই দিনেই বাংলা থিয়েটারের সেই দুর্ধর্ষ কণ্ঠ চিরনিদ্রায় চলে গিয়েছিল। কিন্তু তিন দশকেরও বেশি সময় পর আজও তাঁর নাটক, তাঁর অভিনয়, তাঁর রাজনৈতিক চেতনা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস নতুন প্রজন্মকে প্রশ্ন করে—শিল্প কি শুধু বিনোদন, নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অস্ত্র?

উৎপল দত্তের জীবন যেন সেই প্রশ্নেরই এক দীর্ঘ উত্তর।

বরিশাল থেকে কলকাতা—এক শিল্পীর জন্ম

১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ অবিভক্ত বাংলার বরিশালে জন্ম। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। শেক্সপিয়রের নাটক দিয়ে অভিনয়ের জগতে প্রবেশ, কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি বুঝেছিলেন—থিয়েটারকে কেবল অভিজাত বিনোদনের ঘেরাটোপে আটকে রাখা যায় না।

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন লিটল থিয়েটার গ্রুপ। পরবর্তী সময়ে তাঁর নাট্যচর্চা ক্রমশ যুক্ত হয় মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক ভাবনা এবং সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রামের সঙ্গে।

তাঁর কাছে মঞ্চ ছিল কেবল আলো, পর্দা আর সংলাপের জায়গা নয়। মঞ্চ ছিল প্রশ্ন করার জায়গা। প্রতিবাদের জায়গা। মানুষের কথা বলার জায়গা।

‘অঙ্গার’ থেকে ‘কল্লোল’—নাটক যখন হয়ে ওঠে প্রতিবাদ

১৯৫৯ সালের ‘অঙ্গার’ কয়লাখনি শ্রমিকদের জীবন ও শোষণের নির্মম বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। শ্রমিকের ঘাম, ক্ষুধা, বঞ্চনা—সবকিছুকে তিনি নাটকের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন।

তারপর ১৯৬৫ সালে আসে ‘কল্লোল’। ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই নাটক শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে মঞ্চে তুলে ধরেনি; তা সমকালীন রাজনৈতিক চেতনাকেও আলোড়িত করেছিল।

‘কল্লোল’-এর অভিঘাত এতটাই তীব্র হয়েছিল যে তৎকালীন সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। প্রেসিডেন্সি জেলে বিনা বিচারে আটক থাকতে হয় তাঁকে।

কিন্তু শিকল কি কখনও একজন নাট্যকারের চিন্তাকে বন্দি করতে পারে?

উৎপল দত্তের ক্ষেত্রে পারেনি।

কারাগারের দরজা তাঁর শরীরকে আটকে রেখেছিল, তাঁর কলমকে নয়।

শহরের মঞ্চ ছেড়ে মানুষের মাঠে

উৎপল দত্ত জানতেন, শুধু শহরের প্রেক্ষাগৃহে নাটক করলে সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তাই তিনি যাত্রার মঞ্চে গেলেন।

গ্রামের মাঠে, মফস্বলের জনপদে, শ্রমজীবী মানুষের ভিড়ে তাঁর রাজনৈতিক নাট্যচেতনা পৌঁছে গেল নতুন এক পরিসরে। ‘রাইফেল’, ‘সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’-এর মতো যাত্রাপালায় বিপুল মানুষের সমাগম তাঁর শিল্পের গণভিত্তির প্রমাণ হয়ে উঠেছিল।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন—থিয়েটারের শক্তি শুধু শহরের মঞ্চে নয়, মানুষের মাঝেও।

একই মানুষ, কখনও আগুন—কখনও অট্টহাসি

উৎপল দত্তকে শুধু রাজনৈতিক নাট্যকার হিসেবে দেখলে তাঁর বিশাল শিল্পীসত্তার প্রতি অন্যায় হবে।

তিনি ছিলেন অসাধারণ চলচ্চিত্র অভিনেতা।

মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’-এ তাঁর অভিনয় তাঁকে জাতীয় পুরস্কার এনে দেয়। সত্যজিৎ রায়ের ‘আগন্তুক’-এ তাঁর উপস্থিতি আজও দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

আর হৃষিকেশ মুখার্জির ‘গোলমাল’-এর ভবানী শঙ্কর?

সেখানে সেই একই মানুষ হয়ে উঠেছিলেন হাসির এক কিংবদন্তি চরিত্র।

‘গোলমাল’, ‘নরম গরম’ এবং ‘রং বিরঙ্গি’-র জন্য তিনি তিনবার ফিল্মফেয়ার সেরা কমেডিয়ান পুরস্কার পান।

একদিকে রাজনৈতিক মঞ্চের তীব্র প্রতিবাদ, অন্যদিকে সিনেমার পর্দায় অনবদ্য হাস্যরস—এই দুই বিপরীত স্রোতকে একই শিল্পীসত্তায় ধারণ করেছিলেন উৎপল দত্ত।

আজও কেন উৎপল দত্তকে মনে পড়ে?

কারণ সময় বদলেছে, কিন্তু মানুষের অনেক প্রশ্ন বদলায়নি।

শ্রমিকের অধিকার, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, সামাজিক বৈষম্য, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক, প্রতিবাদের অধিকার—এই প্রশ্নগুলিই তাঁর নাটকের ভিতরে বারবার ফিরে এসেছে।

আজকের পৃথিবীতে যখন শিল্পীর স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়, তখন উৎপল দত্তের নাট্যদর্শন আরও একবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।

তাঁর শিল্প যেন মনে করিয়ে দেয়—নীরবতা সবসময় নিরপেক্ষ নয়। কখনও কখনও নীরবতাও অন্যায়ের পাশে দাঁড়ায়।

১৯৯০ সালে ভারতীয় থিয়েটারে আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সংগীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ লাভ করেন। তার মাত্র তিন বছর পর, ১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট, মাত্র ৬৪ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান।

পর্দা নেমেছে, কিন্তু নাটক শেষ হয়নি

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে ফুল পড়বে, স্মরণসভা হবে, পুরনো নাটকের কথা উঠবে। কিন্তু উৎপল দত্তকে সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো কি শুধু স্মৃতিচারণে সম্ভব?

সম্ভবত নয়।

তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় হল তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলিকে জীবিত রাখা।

যে শিল্পী মঞ্চকে মানুষের কথা বলার জায়গা বানিয়েছিলেন, তাঁকে মনে রাখা মানে অন্যায় দেখলে প্রশ্ন করার সাহসকে মনে রাখা।

যে শিল্পী কারাগারেও কলম থামাননি, তাঁকে মনে রাখা মানে স্বাধীন চিন্তার মর্যাদা রক্ষা করা।

আর যে শিল্পী বিশ্বাস করতেন মঞ্চ মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত, তাঁকে মনে রাখা মানে শিল্পকে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না করা।

আজ উৎপল দত্ত নেই।
কিন্তু তাঁর মঞ্চ আছে।
তাঁর নাটক আছে।
তাঁর প্রশ্ন আছে।
আর আছে সেই অদম্য কণ্ঠস্বর—যে কণ্ঠস্বর আমাদের এখনও বলে, অন্যায় দেখলে চুপ থেকো না।

মঞ্চের আলো নিভে গেছে বহু বছর আগে।
কিন্তু অন্ধকারের মধ্যেও সেই আলো এখনও দেখা যায়।

উৎপল দত্ত—শিল্পী হিসেবে, অভিনেতা হিসেবে, নাট্যকার হিসেবে, প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে—আপনি আজও বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে জীবন্ত।

শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, কৃতজ্ঞতায়—আপনাকে স্মরণ করি। 🕯️🌹

— Views Now ডেস্ক

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies