স্টাফ রিপোর্টার, দুর্গাপুর: টানা বৃষ্টি, পিচ্ছিল মাঠ এবং নিচু বাউন্সের প্রতিকূল পরিস্থিতি—ফুটবলের সমস্ত কারিগরি চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিক্যাল দক্ষতায় ফাইনাল ম্যাচ জিতে নিল 'আমরা কজন বয়েজ ক্লাব'। সিআইটিইউ (CITU) অনুমোদিত ইউনাইটেড কন্ট্রাক্টারস্ ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের পরিচালনায় এবং দুর্গাপুর টাউন ক্লাবের সহযোগিতায় আয়োজিত 'শহীদ নিমai অধিকারী ও পরিতোষ ভট্টাচার্য স্মৃতি এবং মহঃ রফি ফেয়ার প্লে ট্রফি ২০২৬'-এর ৩৬তম বর্ষের ফাইনালে রবিবার ভারতী ভলিবল ক্লাবকে ২-০ গোল ব্যবধানে পরাজিত করল তারা।
ম্যাচের কৌশলগত ও ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণ (Tactical Analysis)
১. প্রতিকূল আবহাওয়া ও পিচ অ্যাডাপ্টেশন:
টানা ভারী বৃষ্টির ফলে মাঠের বেশ কিছু অংশ ভারী ও পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় সংক্ষিপ্ত পাসের (Short Passing Game) পরিবর্তে 'ডাইরেক্ট ফুটবল' ও 'হাই প্রেস'-এর কৌশল গ্রহণ করে 'আমরা কজন বয়েজ ক্লাব'। গ্রাউন্ড পাস আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তারা উইং ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের উইং-ব্যাকের পেছনের খালি জায়গা (Space Execution) ব্যবহার করার ছক কষে।
২. মাঝমাঠের আধিপত্য ও ট্রানজিশন (Midfield Dominance):
টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় বিশ্বেশ্বর বাউরী মাঝমাঠে 'বক্স-টু-বক্স' ভূমিকা পালন করেন। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙার (Interception) পাশাপাশি দ্বিতীয় বল (Second Ball) দখলের লড়াইয়ে 'আমরা কজন'-এর খেলোয়াড়রা ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়। প্রতিরক্ষামূলক গঠন থেকে দ্রুত আক্রমণে উঠে যাওয়ার (Defensive to Attacking Transition) গতিই ম্যাচটির পার্থক্য গড়ে দেয়।
৩. গোল দুটির ট্যাকটিক্যাল রূপরেখা:
- প্রথম গোল (আকাশ বাউরী - ৬ নম্বর জার্সি): মাঝমাঠ থেকে তৈরি হওয়া একটি উইংভিত্তিক আক্রমণের ফল। ডানপ্রান্ত থেকে আসা ইন-সুইঙ্গিং ক্রসে চমৎকার পজিশনিং রেখে অফ-দ্য-বল মুভমেন্টের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে বিভ্রান্ত করেন ৬ নম্বর জার্সিধারী আকাশ বাউরী। পিচ্ছিল মাঠে বল গ্রিপ করতে না পেরে গোলরক্ষক পরাস্ত হলে ঠাণ্ডা মাথায় ক্লিনিকাল ফিনিশে গোল করেন তিনি।
- দ্বিতীয় গোল (অভিজিৎ টুডু - ১৫ নম্বর জার্সি): ভারতী ভলিবল ক্লাব সমতায় ফিরতে উঠে এলে তাদের ডিফেন্স লাইনের পেছনে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গায় কাউন্টার-অ্যাটাক তৈরি করে 'আমরা কজন'। ১৫ নম্বর জার্সিধারী অভিজিৎ টুডু নিজের গতি ও শারীরিক শক্তির নিখুঁত ব্যবহারে প্রতিপক্ষের হাই-লাইন ডিফেন্স চিরে বল বের করে আনেন এবং একক প্রচেষ্টায় নিখুঁত প্লেসমেন্টে দ্বিতীয় গোলটি করেন। এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই তাঁকে 'ম্যান অব দ্য ম্যাচ' নির্বাচন করে।
৪. রক্ষণভাগ ও গোলকিপিংয়ের প্রাচীর:
ভারতী ভলিবল ক্লাবের সেরা ফরোয়ার্ড বাবুলাল হাঁসদা বেশ কয়েকটি বিপজ্জনক আক্রমণ তৈরির চেষ্টা করলেও 'আমরা কজন'-এর সেরা ডিফেন্ডার সমীর সোরেণ কঠোর ম্যান-মার্কিং ও সময়োপযোগী ট্যাকেলে তাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখেন। ভিজা ও পিচ্ছিল বল সামলাতে টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষক সন্দীপন দাস পেনাল্টি বক্সের ভেতর দুর্দান্ত এরিয়াল কমান্ড (Aerial Command) এবং গ্রিপিং দক্ষতার পরিচয় দেন, যার ফলে ভারতী ভলিবল ক্লাবের কোনো সেট-পিসই বিপদ তৈরি করতে পারেনি।
রেফারিংয়ের দক্ষতা
ভারী বৃষ্টি ও ট্যাকটিক্যাল ফাউলের ম্যাচে চমৎকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন রেফারি প্যানেল:
- প্রধান রেফারি: তারক নাথ ঠাকুর
- সহকারী রেফারি: ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জী ও অনিল কোড়া
- চতুর্থ রেফারি: জীতেন রুইদাস
ব্যক্তিগত সম্মাননা ও পুরস্কার তালিকা
- ফাইনাল খেলার সেরা খেলোয়াড় (Man of the Match): অভিজিৎ টুডু (আমরা কজন বয়েজ ক্লাব)
- টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় (Player of the Tournament): বিশ্বেশ্বর বাউরী (আমরা কজন বয়েজ ক্লাব)
- টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষক: সন্দীপন দাস (আমরা কজন বয়েজ ক্লাব)
- টুর্নামেন্টের সেরা ডিফেন্ডার: সমীর সোরেণ (আমরা কজন বয়েজ ক্লাব)
- টুর্নামেন্টের সেরা ফরোয়ার্ড: বাবুলাল হাঁসদা (ভারতী ভলিবল ক্লাব)
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও অতিথিবৃন্দ
খেলার পূর্বে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করেন শ্রমিক নেতা নিমাই ঘোষ। ৩৬তম বর্ষ উপলক্ষে আকাশে ৩৬টি বর্ণিল বেলুন উড়িয়ে ম্যাচের সূচনা করা হয়। ধামসা-মাদলের তালে কিশোরবাহিনীর মার্চ পাস্ট ট্রফিসহ মাঠ পরিক্রমা করে এক অভূতপূর্ব আবহের সৃষ্টি করে।
মঞ্চে বিশেষ সংবর্ধনা জানানো হয় সাবেক জাতীয় ফুটবলার মনোজিত দাস এবং দুর্গাপুরের উদীয়মান ব্যাডমিন্টন তারকা শরণ্য গুপ্ত-কে।
উপস্থিত ছিলেন সাবেক সাংসদ সাইদুল হক, সুনীল খান, প্রাক্তন বিধায়ক সন্তোষ দেবরায়, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক সুখময় বোস, মহকুমা ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সম্পাদক বিধান মজুমদার, রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আশীষ মন্ডল, সমাজসেবক সুদেব রায়, ডিএসপি (DSP) আধিকারিকবৃন্দ এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
টুর্নামেন্ট কমিটির পক্ষে প্রকাশ তরু চক্রবর্তী প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও অসাধারণ খেলা উপহার দেওয়ার জন্য সকল খেলোয়াড়, সংগঠক ও দর্শক সাধারণকে ধন্যবাদ জানান।






























