বিশেষ সংবাদদাতা, দুর্গাপুর:
শিল্পনগরী দুর্গাপুর আজ থমকে গিয়েছিল এক অপূরণীয় ক্ষতির বেদনায় । মেহনতি মানুষের পরম আত্মীয়, প্রাক্তন বিধায়ক এবং আধুনিক দুর্গাপুরের অন্যতম কারিগর কমরেড বিপ্রেন্দু কুমার চক্রবর্তী (সকলের শ্রদ্ধেয় 'ভজনদা') আর নেই । দীর্ঘ দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই শেষ করে ৭৬ বছর বয়সে ১লা সেপ্টেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । বুধবার সকালে তাঁর শেষ যাত্রাকে কেন্দ্র করে এক অভূতপূর্ব জনস্রোতের সাক্ষী থাকল গোটা দুর্গাপুর শহর ।।
সংগ্রামময় রাজনৈতিক জীবনের ইতি
১৯৫০ সালে বাংলাদেশের রংপুরে জন্মগ্রহণকারী বিপ্রেন্দু চক্রবর্তী ১৯৬২ সাল থেকে স্থায়ীভাবে দুর্গাপুরের বাসিন্দা হন । ছাত্রজীবনেই ১৯৬৬-র খাদ্য আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বামপন্থী রাজনীতিতে আগমন । ৭০-এর দশকের রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও শারীরিক নিগ্রহের শিকার হয়ে কলেজ ছাড়তে হলেও লড়াই থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি । পরবর্তীতে ২০০৬ সালের দুর্গাপুর পশ্চিম বিধানসভার বিধায়ক হিসেবে, কিংবা দুর্গাপুর নোটিফাইড এরিয়া অথরিটি (DNAA), আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদ (ADDA) এবং দুর্গাপুর নগর নিগমের (DMC) মেয়র পরিষদের সদস্য হিসেবে ৯০-এর দশকে রুগ্ণ শিল্প শহর দুর্গাপুরকে আধুনিক শিক্ষানগরী ও শিল্প হাবে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল ঐতিহাসিক ।
বিমল দাসগুপ্ত ভবনে রক্তপতাকায় শেষ শ্রদ্ধা
বুধবার সকালে তাঁর মরদেহ যখন সিপিআই(এম)-এর স্থানীয় কার্যালয় বিমল দাসগুপ্ত ভবনে এসে পৌঁছায়, সেখানে এক থমথমে ও শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয় । পার্টি পতাকায় তাঁর দেহাংশ ঢেকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানান সিপিআই(এম) পশ্চিম বর্ধমান জেলা সম্পাদক গৌরাঙ্গ চট্টোপাধ্যায়, প্রাক্তন মহানাগরিক রথীন রায়, শীর্ষ নেতৃত্ব আভাস রায় চৌধুরী এবং বিনয় কৃষ্ণ চক্রবর্তী । রাজনৈতিক ভিন্নতা ভুলে তাঁর নশ্বর দেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মীরা ।।
'গণশক্তি' থেকে পৌরসভা:
শেষ পথের মিছিলে শুধুই জনতা
বিমল দাসগুপ্ত ভবন থেকে এক ঐতিহাসিক শোকমিছিলের সূচনা হয় । আমৃত্যু নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব সামলানো তাঁর প্রিয় কর্মস্থল 'গণশক্তি' পত্রিকার দুর্গাপুর দফতরে নিয়ে যাওয়া হয় মরদেহ । পথে দুই ধারে মানুষ নীরবে দাঁড়িয়ে চোখের জলে তাঁকে বিদায় জানান । 'গণশক্তি' কার্যালয়ে মাল্যদানের পর মিছিল এগোয় তাঁর হাত ধরে গড়ে ওঠা দুর্গাপুর নগর নিগম (DMC) ভবনে ।।
সেখানে উপস্থিত হয়ে দুর্গাপুর পশ্চিমের বর্তমান বিধায়ক (বিজেপি) চন্দ্র শেখর ব্যানার্জী (বা প্রতিনিধিদল) সহ শাসক ও বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা দলমত নির্বিশেষে পুষ্পস্তবক প্রদান করে শ্রদ্ধা জানান । এর মাধ্যমে পুনরায় প্রমাণিত হলো—রাজনৈতিক দর্শনে পৃথক হলেও মানুষের সমস্যায় ভজনদার অবারিত দ্বারের কথা শহরের সবাই একবাক্যে স্বীকার করতেন ।।
শ্রমিক আন্দোলন থেকে বীরভানপুর শ্মশান
নগর নিগম থেকে বিশাল শোকমিছিল এসে পৌঁছায় শ্রমিক সংগঠন সিআইটিইউ (CITU) কার্যালয়ে । ইস্পাত ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের হাজারো মেহনতি শ্রমিক তাঁদের প্রিয় অভিভাবককে অশ্রুসজল চোখে শেষ প্রণতি জানান । সেখান থেকে সর্বস্তরের মানুষের ভিড় ঠেলে মিছিল পৌঁছায় বীরভানপুর শ্মশানে ।।
দুপুরের পর সম্মান ও শেষ শ্রদ্ধার সাথে তাঁর অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া সম্পন্ন হয় । বীরভানপুরের চিতাবহ্নিতে সমাপ্ত হলো ছয় দশকের এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আধুনিক দুর্গাপুর নির্মাণের এক অমূল্য অধ্যায় । তবে দুর্গাপুরের প্রতিটি ইট, রাস্তাঘাট এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে রইলেন 'ভজনদা' ।














