অ্যাথেন্স, ৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ: এক ঐতিহাসিক ও চরম উত্তেজনাপূর্ণ বিচারের পর অ্যাথেন্সের বিশিষ্ট ও বিতর্কিত দার্শনিক সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে । অ্যাথেন্সের আদালত ও জুরি তাঁকে তরুণদের বিপথগামী করা এবং রাষ্ট্র-অনুমোদিত দেবদেবীদের অবমাননা বা ধর্মদ্রোহিতার (impiety) অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে । তবে শহরের সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই বিচারকে অনেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত বলে মনে করছেন ।
অভিযোগ ও নেপথ্যের সংঘাতসমূহ:
- প্রভাবশালী নেতাদের অজ্ঞতা প্রকাশ: সক্রেটিস দীর্ঘদিন ধরে অ্যাথেন্সের প্রকাশ্য স্থানে ঘুরে ঘুরে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, কবি ও অভিজাতদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক করতেন (সক্রেটিক পদ্ধতি) [১, ৩]। তাঁর এই সূক্ষ্ম ও যৌক্তিক প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতেন যে, প্রভাবশালী নেতারা প্রকৃতপক্ষে ন্যায়বিচার ও শাসন সম্পর্কে খুবই কম জানেন, যা জনসাধারণের সামনে তাঁদের জনসমক্ষে হেয় করত ।
- অ্যাথেন্সের গণতন্ত্রের সমালোচনা: সক্রেটিস খোলাখুলিভাবে অ্যাথেন্সের প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করেছিলেন । তিনি যুক্তি দিতেন যে, লটারির মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করা অনুচিত; শাসন করার জন্য বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন । তিনি অ্যাথেন্স শহরকে একটি জাহাজের সাথে তুলনা করে বলতেন, জাহাজ যেভাবে লটারির মাধ্যমে অনভিজ্ঞ নাবিক দিয়ে নয়, বরং একজন দক্ষ ক্যাপ্টেন দ্বারা চালানো উচিত, তেমনি রাষ্ট্রও দক্ষ ব্যক্তি দ্বারা চালিত হওয়া উচিত ।
- দেশদ্রোহী ও স্বৈরাচারীদের সাথে সংশ্লিষ্টতা: সক্রেটিসের কয়েকজন ছাত্র ও সহযোগী অ্যাথেন্সের চরম শত্রুতে পরিণত হয়েছিল । তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অ্যালসিবিয়াডিস, যিনি পেলোপোনেসিয়ান যুদ্ধে অ্যাথেন্সের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে স্পার্টার পক্ষে যোগ দেন । এছাড়া অন্য দুই ছাত্র ক্রিটিয়াস এবং চার্মাইডিস ছিলেন স্পার্টা-সমর্থিত ৩০ জন স্বৈরাচারী শাসকের (Thirty Tyrants) নেতা, যারা ৪০৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে অ্যাথেন্সের গণতন্ত্রকে হটিয়ে নির্মমভাবে প্রায় ১,৫০০ নাগরিককে হত্যা করেছিল ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও 'বলির পাঁঠা':
৪০৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পেলোপোনেসিয়ান যুদ্ধে স্পার্টার কাছে অ্যাথেন্সের চরম পরাজয় ঘটে । অ্যাথেন্সের শাসকরা মূলত যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর অ্যাথেন্সে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে এবং সাম্প্রতিক জাতীয় বিপর্যয়গুলোর জন্য সক্রেটিসকে একটি 'বলির পাঁঠা' (scapegoat) হিসেবে ব্যবহার করছেন । গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারকারী বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ অ্যানিটাসের নেতৃত্বে সক্রেটিসের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করা হয় ।
বিচারের শেষ মুহূর্ত ও সক্রেটিসের অনমনীয় অবস্থান:
৫০০ জনের এক বিশাল জুরির সামনে সক্রেটিসের এই ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠিত হয় । বিচারে অনুশোচনা প্রকাশ করা বা নির্বাসনে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার পরিবর্তে, সক্রেটিস নিজেকে ঈশ্বরের পাঠানো এক "ডাব-মাছি" (gadfly) হিসেবে বর্ণনা করেন, যার কাজ অ্যাথেন্স নামক অলস ঘোড়াটিকে হুল ফুটিয়ে সচেতন রাখা । তাঁর এই অনমনীয় মনোভাব এবং নতি স্বীকার না করার কারণে জুরি ও শাসকেরা শেষ পর্যন্ত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিতে বাধ্য হন ।





