বিশ্ব মানচিত্রে ১৬ই সেপ্টেম্বর একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও পরিবর্তনকারী দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দীর ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র পাপুয়া নিউ গিনি। বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় এই ভূখণ্ডে ৮০০টিরও বেশি পৃথক আদিবাসী ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছাড়াই একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করার এই প্রক্রিয়া ইতিহাসের এক অনবদ্য অধ্যায়।
১. ঔপনিবেশিক শাসনের জটিল পটভূমি
পাপুয়া নিউ গিনির স্বাধীনতার ইতিহাস বুঝতে হলে এর ১৯ শতকের বিভক্ত ঔপনিবেশিক কাঠামো জানা প্রয়োজন:
- দ্বৈত ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ: ১৯ শতকের শেষভাগে দ্বীপ অঞ্চলটি মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। উত্তর অংশ নিয়ন্ত্রণ করত জার্মান সাম্রাজ্য, যা ‘জার্মান নিউ গিনি’ (German New Guinea) নামে পরিচিত ছিল। অপরদিকে দক্ষিণ অংশ নিয়ন্ত্রণ করত যুক্তরাজ্য, যা ‘ব্রিটিশ নিউ গিনি’ (British New Guinea) নামে পরিচিত ছিল।
- অস্ট্রেলিয়ার নিকট নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর: ১৯০২ সালে যুক্তরাজ্য তার অংশের প্রশাসনিক দায়িত্ব নবগঠিত কমনওয়েলথ অফ অস্ট্রেলিয়ার হাতে তুলে দেয়, যার নাম হয় ‘টেরিটরি অফ পাপুয়া’।
- প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন অস্ট্রেলীয় বাহিনী জার্মান অংশটিও দখল করে নেয়। পরবর্তীতে জাতিপুঞ্জ (League of Nations) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ (United Nations)-এর ট্রাস্টিশিপের অধীনে অস্ট্রেলিয়া এই দুই অংশকে প্রশাসনিকভাবে একত্রিত করে ‘টেরিটরি অফ পাপুয়া অ্যান্ড নিউ গিনি’ হিসেবে পরিচালনা শুরু করে।
২. স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার পদধ্বনি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের ঢেউ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও এসে পড়ে। ১৯৬০-এর দশক থেকে অস্ট্রেলীয় প্রশাসনের অধীনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে কাজ শুরু হয়।
- হাউস অফ অ্যাসেম্বলি ও রাজনৈতিক সচেতনতা: ১৯৬৪ সালে প্রথমবার সর্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে ‘হাউস অফ অ্যাসেম্বলি’ গঠিত হয়। এখান থেকেই স্থানীয় নেতাদের মধ্যে স্বায়ত্তশাসন এবং পূর্ণ স্বাধীনতার চেতনা স্পষ্ট হতে থাকে।
- প্যাঙ্গু পার্টি (Pangu Pati) ও মাইকেল সোমারে: ১৯৬৭ সালে তরুণ রাজনীতিবিদ স্যার মাইকেল সোমারে, আলবার্ট মাউরি কিকি এবং অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে ‘প্যাঙ্গু পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই দলের প্রাথমিক ও মূল লক্ষ্য ছিল অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্বায়ত্তশাসন আদায় এবং দ্রুত পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করা।
- ১৯৭২ সালের নির্বাচন ও স্বায়ত্তশাসন: ১৯৭২ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্যাঙ্গু পার্টি বিশাল সাফল্য অর্জন করে এবং মাইকেল সোমারে কোয়ালিশন সরকারের চিফ মিনিস্টার (Chief Minister) হন। তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বের ফলস্বরূপ ১৯৭৩ সালের ১ই ডিসেম্বর পাপুয়া নিউ গিনি অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন (Self-Government) অর্জন করে।
৩. ১৬ই সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫: ঐতিহাসিক রূপান্তর
স্বায়ত্তশাসন অর্জনের পর মাইকেল সোমারে এবং অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন সংস্কারবাদী প্রধানমন্ত্রী গফ হুইটলাম (Gough Whitlam) একটি মসৃণ হস্তান্তর প্রক্রিয়ার রূপরেখা তৈরি করেন।
- পতাকা অবনামন ও উত্তোলন: ১৯৭৫ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানী পোর্ট মোর্সবির স্যার হুবার্ট মারে স্টেডিয়ামে এক আবেগঘন পরিবেশে অস্ট্রেলিয়ার ‘ইউনিয়ন জ্যাক’ সমন্বিত পতাকা অবনমিত করা হয়। ঠিক তার পরদিন, ১৬ই সেপ্টেম্বর ভোরের সূর্য ওঠার সাথে সাথে স্যার হিউবার্ট মারে স্টেডিয়াম এবং ইন্ডিপেন্ডেন্স হিলে উন্মোচিত হয় স্বাধীন পাপুয়া নিউ গিনির নতুন পতাকা—কালো ও লাল ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘বার্ড অফ প্যারাডাইস’ এবং ‘সাউদার্ন ক্রস’ তারকাখচিত লাল-কালো জাতীয় পতাকা।
- সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন: প্রিন্স অফ ওয়েলসের (তৎকালীন প্রিন্স চার্লস) উপস্থিতিতে পাপুয়া নিউ গিনি কমনওয়েলথের অধীনে এক স্বাধীন সাংবিধানিক রাজতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং মাইকেল সোমারে স্বাধীন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
৪. জাতীয় ঐক্যের চ্যালেঞ্জ ও সোমারে রূপকথা
পাপুয়া নিউ গিনির স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল ভূখণ্ডগত ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দূর করা। ভৌগোলিক দূরত্ব, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং শত শত আদিবাসী গোত্রীয় বৈচিত্র্যের কারণে স্বাধীনতার ঠিক পূর্বে বুকেনভিল (Bougainville) এবং পাপুয়ান অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দেখা দিয়েছিল।
স্যার মাইকেল সোমারে কোনো সশস্ত্র বলপ্রয়োগ না করে আলোচনার মাধ্যমে এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়ানটোক’ (Wantok) সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সকল গোষ্ঠীকে একটি সংবিধানে একত্রিত করতে সক্ষম হন। এ কারণেই তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে "ফাদার অফ দ্য নেশন" (Father of the Nation) বলা হয়।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
পাপুয়া নিউ গিনির ১৬ই সেপ্টেম্বরের স্বাধীনতা বিশ্বের ইতিহাসে একটি বিরল উদাহরণ, যেখানে বহুভাষিক ও আদিবাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক উপায়ে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব লাভ করেছিল। প্রতি বছর ১৬ই সেপ্টেম্বর সমগ্র দেশে ঐতিহ্যবাহী নাচ, গান, প্যারেড ও সাংস্কৃতিক উৎসবের মাধ্যমে তাদের এই ঐতিহাসিক বিজয় উদযাপিত হয়।

