কলকাতা থেকে কিছুটা এগোলেই হাওড়ার গ্রামীণ জনপদ আমতা। শতাব্দী প্রাচীন মেলাইচণ্ডী মন্দির, কালীতলা কিংবা দামোদর নদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই জনপদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক হারিয়ে যাওয়া রেলপথের ইতিহাস—মার্টিন রেল (Martin Light Railway)।
ইউটিউব চ্যানেল Backbench Historian-এর বিশেষ তথ্যচিত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই ভ্রমণ ও ইতিহাসধর্মী প্রতিবেদনে ফিরে দেখা যাক বাংলার সেই স্মৃতির ধুলোবালি মাখা ন্যারোগেজ ট্রেনের ঐতিহ্য।
মার্টিন রেলের পথচলা ও ইতিহাস
উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ১৮৫৪ সালের ১৫ই আগস্ট হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত প্রথম পরীক্ষামূলক রেল চলাচল শুরু হয়। কিন্তু বড় ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে মূলত শহরমুখী রুটগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখায় গ্রামীণ বাংলার সঙ্গে কলকাতার সংযোগ ঘটাতে আবির্ভাব ঘটে ফিডার লাইনের।
- সূচনা: ১৮৯০ থেকে ১৯৪৭ সাল ছিল প্রাইভেট ছোট রেলওয়েগুলোর স্বর্ণযুগ। ১৮৯৭ সালে স্যার বীরেন মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পোদ্যোগীদের হাত ধরে হাওড়া ও হুগলি জেলায় মার্টিন রেলের শুভসূচনা হয়।
- বিস্তৃতি: হাওড়া-আমতা, হাওড়া-শিয়াখালা এবং পরবর্তীতে বারাসাত-বসিরহাট লাইট রেলওয়ে হিসেবে তিনটি জেলার গ্রামীণ জীবনে নতুন যোগাযোগের পথ খুলে দেয় এই ছোট ন্যারোগেজ ট্রেন।
লোকগাথা ও মেঠো জীবনের নস্টালজিয়া
মার্টিন রেল কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার যান ছিল না; এটি ছিল গ্রামীণ মানুষের অত্যন্ত আপনজন।
- উঠোন দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে যাত্রা: কারো বাড়ির উঠোন, তো কারো বাগানের পাশ দিয়ে কালচে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মন্থর গতিতে চলে যেত ছোট এই ট্রেন।
- মানবিক ড্রাইভারের গল্প: স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, কেউ আত্মহত্যা করতে রেললাইনে শুয়ে পড়লে চালক নাকি ট্রেন থামিয়ে তাঁকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন!
- খাবারের আমেজ: পাতিহাল, বেলেগ্রামের বিখ্যাত মিষ্টি, ধোঁয়া ওঠা খৈচুর কিংবা মাজুর তৈরি সামগ্রীর গন্ধে ট্রেনের কামরা মাতিয়ে রাখতো হকারেরা।
কেন হারিয়ে গেল এই ট্রেন?
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে দ্রুতগতির যানবাহনের চাহিদার কাছে ন্যারোগেজ মার্টিন রেল পিছু হটতে শুরু করে:
- গতি ও প্রযুক্তি: ব্রডগেজ লাইনের সম্প্রসারণ এবং উন্নত বাস রুটের ফলে মন্থর গতির মার্টিন রেলের উপযোগিতা কমে যায়।
- আর্থিক ক্ষতি: টিকিটের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকা এবং বিনা টিকিটে ভ্রমণের প্রবণতা বাড়ায় কোম্পানি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।
১৯৭১ সালে হাওড়ার দুটি রুটেই শেষবারের মতো চাকা অচল হয় মার্টিন রেলের। আজ সেই লাইনগুলো নেই, তবে বাংলার ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাসপ্রেমীদের হৃদয়ে এটি রয়ে গেছে এক পরম স্মৃতির মিউজিয়াম হিসেবে।
মূল ভিডিও তথ্য: সম্পূর্ণ তথ্যচিত্রটি দেখতে পারেন Backbench Historian ইউটিউব চ্যানেলে।








