ব্রাসিলিয়া, ২৬ অক্টোবর ২০২৬: সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও রোমাঞ্চকর জয়ের মুখ দেখলেন বামপন্থী রাজনীতির বরপুত্র লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। গতকাল রবিবার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রান-অফ (দ্বিতীয় ধাপ) নির্বাচনে সেনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের মতো দেশটির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন হতে যাচ্ছেন তিনি। প্রথম পর্বের ভোটাভুটিতে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয় পর্বে এই ঐতিহাসিক ঘুরে দাঁড়ানো আধুনিক ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
সুপ্রিম ইলেকটোরাল কোর্ট (TSE) ঘোষিত চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী, প্রদত্ত ভোটের ৫১.৮ শতাংশ পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন লুলা। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কট্টর ডানপন্থী সেনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২ শতাংশ ভোট। প্রায় ৪.৪ মিলিয়ন (৪৪ লাখ) ভোটের স্পষ্ট ব্যবধানে অর্জিত এই জয় লুলার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে অন্যতম কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালে সামরিক স্বৈরাচারের পতনের পর থেকে আজ পর্যন্ত ব্রাজিলে কোনো প্রার্থী প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকে রান-অফ নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেননি—লুলা সেই দীর্ঘদিনের ধারা ভেঙে নতুন ইতিহাস রচনা করলেন।
প্রথম পর্বের ঘাটতি ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
চলতি মাসের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত প্রথম পর্বের নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর পুত্র ফ্লাভিও বোলসোনারো অপ্রত্যাশিতভাবে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে যান। চরম ডানপন্থী শিবিরের এই অগ্রগামিতা লুলার ওয়ার্কার্স পার্টি (PT) এবং প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক জোটের জন্য মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রথম পর্বের এই ফলাফলে ল্যাটিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটির রাজনীতিতে আবারও কট্টর জাতীয়তাবাদী ও পপুলিস্ট ধারার শক্তিশালী উত্থানের ইঙ্গিত মিলছিল।
তবে দ্বিতীয় পর্বের প্রচারণায় কৌশলগত পরিবর্তন আনেন ৮০ বছর বয়সী প্রবীণ রাজনীতিক লুলা। তিনি কেবল ঐতিহ্যবাহী দলীয় কর্মী ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারণার ওপর নির্ভর না করে সমাজের বিভিন্ন তৃণমূল সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন, পরিবেশবাদী সংস্থা এবং অনানুষ্ঠানিক জনগোষ্ঠীকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা পুনরুজ্জীবিত করা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজন দূর করার মধ্যপন্থী প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি দ্রুত দোদুল্যমান ভোটারদের মন জয় করতে সক্ষম হন।
নির্বাচনের মোড় ঘোরাতে অ্যান্টিফা উল্ট্রাস ও পালমেইরাস সমর্থক গোষ্ঠী
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ (সাবেক টুইটার) অ্যান্টিফা উল্ট্রাস (Antifa ultras) অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত চিত্র ও বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে এসে দেশজুড়ে সংগঠিত ফুটবল সমর্থক গোষ্ঠীগুলো (Torcidas Organizadas) কীভাবে রাজপথে নেমে নির্বাচনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।
প্রথম দফায় ডানপন্থীদের অগ্রগতির পর ব্রাজিলের ফুটবলাঙ্গনের প্রগতিশীল ও বামপন্থী সমর্থকরা এক অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে তোলেন। বিশেষ করে, ঐতিহাসিক ও জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাব পালমেইরাস (Palmeiras)-এর উগ্র-বিরোধী ও অ্যান্টিফা সমর্থক গোষ্ঠীগুলো সরাসরি লুলার পক্ষে গণ-প্রচারণায় নেমে পড়ে। প্রকাশ পাওয়া ফুটেজ ও প্রতিবেদনে যেসব গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে উঠেছে:
- ব্যাপক তৃণমূল সংহতি: পালমেইরাসের সমর্থকরা কেবল স্টেডিয়ামে সীমাবদ্ধ না থেকে শহর ও উপশহরগুলোতে মিছিল, লিফলেট বিতরণ এবং সাধারণ মানুষকে ভোটকেন্দ্রে আনার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত প্রচারণা পরিচালনা করে।
- ক্লাবের ভাবমূর্তি সংশোধন: পালমেইরাস ক্লাবের সমর্থকদের একাংশের সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক উপাদানের কিছুটা সম্পর্ক বা পরিচিতি ছিল। তবে অ্যান্টিফা ও সাধারণ সমর্থকদের এই গণ-অংশগ্রহণ ক্লাবের দীর্ঘদিনের পুরোনো সামাজিক ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ বদলে দেয় এবং তাদের প্রগতিশীল জনকল্যাণমুখী শক্তিতে রূপান্তর করে।
- ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিরোধ: ভোটের দিন এবং তার আগের দিনগুলোতে কট্টর ডানপন্থীদের সম্ভাব্য হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিপরীতে ফুটবল সমর্থক গোষ্ঠীগুলো রাজপথে পাহারা দিয়ে সাধারণ ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসার পরিবেশ তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলীয় সমাজে ফুটবলের সামাজিক ও আবেগীয় প্রভাব অত্যন্ত গভীরে। ফুটবল সমর্থকদের এই রাজনৈতিক সচেতনতা ও সমন্বিত প্রতিরোধই মূলত দোলাচলে থাকা লাখ লাখ তরুণ ও শ্রমজীবী ভোটারের মনভোলাতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, যা শেষ পর্যন্ত লুলার ঝুলিতে ৪৪ লাখেরও বেশি অতিরিক্ত ভোট নিশ্চিত করে।
অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
লুলার এই বিজয়ে বিশ্বনেতারা দ্রুত অভিনন্দন জানিয়েছেন। পরিবেশ রক্ষা, আমাজন বন সংরক্ষণ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তিতে ব্রাজিলের প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি বিশ্বজুড়ে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। পাশাপাশি ব্রিকস (BRICS) জোটে লুলার নেতৃত্ব এবং গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধি হিসেবে ব্রাজিলের অবস্থান আরও শক্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে অভ্যন্তরীণভাবে লুলার সামনে পর্বতসম চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ব্রাজিলের জাতীয় কংগ্রেসে সেনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারোর সমর্থিত ডানপন্থী জোট শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফলে যেকোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতি পাসের ক্ষেত্রে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হবে। এছাড়া প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটারের সমর্থন পাওয়া ডানপন্থী শিবিরকে আশ্বস্ত করে চরমভাবে মেরুকৃত ব্রাজিলীয় সমাজকে পুনঃএকত্রিত করাই হবে লুলার চতুর্থ মেয়াদের মূল রাজনৈতিক পরীক্ষা।
লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার এই ঐতিহাসিক জয় প্রমাণ করে যে, ব্রাজিলের রাজনীতিতে তৃণমূল সামাজিক আন্দোলন এবং যুবসমাজের প্রতিরোধ কতটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।


