লেখক: : মধূ সুদন দরিপা
ব্রিটানিয়া বিস্কুট কোম্পানির এই নিওন সাইন বোর্ডটি ষাটের দশক কিংবা তারও আগে থেকে বাঁকুড়া শহরের বড়বাজার অঞ্চলে সত্যপীর তলায় নাপিত গলির বিপরীতে আমার ঠাকুরদা প্রহ্লাদ চন্দ্র দরিপার নামানুসারে " পি সি দরিপা " মনোহারী এজেন্সি দোকানের মাথায় শোভা পেত। তখন একতলা দোকান ছিল। নীল নিওন সাইনের আলো জ্বলে উঠতো সন্ধে বেলায়। ১৯৫০ সাল থেকে ব্রিটানিয়া বিস্কুট কোম্পানির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। তখন প্যারী কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসায়িক চুক্তি হয়েছিল । দুর্গাপুর ব্যারেজ নির্মাণের আগে রাণীগঞ্জ হয়ে বিস্কুটের ট্রাক আসতো কলকাতার তারাতলা কারখানা থেকে । নৌকাতে ট্রাক চাপিয়ে দামোদর নদ পার করা হতো। অনেক সময় আমার বাবা ঐ ট্রাকে চেপে কলকাতা থেকে বিস্কুট নিয়ে আসতেন । আমাদের কেরাণী বাজারের বাড়িতে বিস্কুট রাখা হতো। সেসময় সবচেয়ে বেশি বিক্রি ছিল থিন এরারুট বিস্কুট। পাঁচ কেজি কিনে প্যাক করা থাকতো লুজ বিস্কুট ।
আমি ১৯৬০-৬১ সালে নুনগোলা রোডে লক্ষ্মী পণ্ডিতের পাঠশালায় পড়তে যেতাম আমাদের কেরাণী বাজারের বাড়ি থেকে হেঁটে হেঁটে। বিকেল বেলা ছুটি হলে ঐ দোকানে যেতাম। দাদু কোনো কোনো দিন এক আনা পয়সা দিতেন। পরে ভারী সীসার পাঁচ পয়সা। আমি দশের বাঁধের গাজন মেলায় কেনা মাটির কূমে ( ভাষান্তরে কূপে) ফেলতাম। ভর্তি হয়ে গেলে ছুটির দিন বাড়ির উঠোনে বসে ধাতব জিবছোলা দিয়ে কূমের ছোট ফাঁক দিয়ে টেনে টেনে পয়সা গুলো বের করে আনতাম। দশটি করে থাক দিয়ে সাজিয়ে মোট কতো টাকা হলো গুনে মাকে জানাতাম।
দাদু ষাটের দশকে মাদুর পেতে ঐ দোকানে বসতেন। সামনে কাচের জারে ক্যাডবেরি মর্টন চকলেট থাকতো। অনেক নামী দামি মানুষ আসতেন সকাল সন্ধ্যা সেখানে। দাদু এবং আমার বাবা শশাঙ্কশেখরের পরিচিতি সুবাদে। যেমন প্রথিতযশা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্বশুর মশাই জিতেন বাবু। ওনার বাড়ি ছিল স্কুল ডাঙায়। ঐ বাড়িতে একটি কাঁঠাল গাছ এখনও আছে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সেখানে এসে রাত্রিবাস করেছেন। পরবর্তীতে ঐ বাড়িটি খ্রিস্টান কলেজের অধ্যাপক হরিদাস আচার্য কিনে নেন। আমাদের বড়বাজার দোকানে আসতেন অধ্যাপক কবি গোপাল লাল দে মহাশয়। তিনি আমার ঠাকুর দার বন্ধু ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রী পার্থ দে তাঁর পুত্র। শুনেছি বালক পার্থকে দোকানে দাদুর কাছে বসিয়ে রেখে গোপাল বাবু চকবাজারে অথবা বড় বাজারে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র কিনতে যেতেন। এছাড়াও আসতেন বাঁকুড়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা উমা দেবী। আমার বাবা ঐ স্কুলের পরিচালন সমিতির সদস্য ছিলেন। আসতেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সত্যনারায়ণ বাজোরিয়া, চিকিৎসক ডা. অবনী ভট্টাচার্য প্রমুখ।
এই নিওন সাইনবোর্ডটি ১৯৭৬-৭৭ সালে যখন বড়বাজারের একতলা দোকানটি ভেঙ্গে নতুন চারতলা করা হয়, তখন আমাদের কেরাণী বাজারের বাড়ির ছাদে লাগানো হয়।
রথযাত্রার দিন আমরা দূর থেকে চিহ্নিত করতাম আমাদের ঐ নিওন সাইনবোর্ডটি দেখে আর কতদূরে আছে। প্রথমে বড়ো রথ ( আদতে উচ্চতায় কম, কিন্তু প্রাচীনত্বে বেশি দিনের) এবং ছোট রথ। দুটি সুউচ্চ পিতলের রথ আলোর মালা দিয়ে সাজিয়ে পরিক্রমায় বের হতো । ১৯৫৬ সালে ছোট রথটি বঙ্গ বিদ্যালয় মাঠে তিন দিন ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আষাঢ় মাসে। আজও আমাদের কেরাণী বাজারের বাড়ির ছাদে প্রায় ৫০ বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী এই নিওন সাইনবোর্ডটি লাগানো আছে। আমাদের পরিবারের অন্যতম একটি পরিচিত মুখের প্রতীক হিসেবে।


