নাগরিক কমিটির ডাকে বিক্ষোভে উত্তাল দুর্গাপুরের ইস্পাত কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ভবন
দুর্গাপুর: নাগরিক পরিষেবার অব্যবস্থাপনা, শ্রমিকদের অধিকার হরণ এবং দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত সমস্যাগুলির সমাধানের দাবিতে দুর্গাপুরে বামেদের উদ্যোগে গঠিত নাগরিক কমিটির ডাকে আজ এক বৃহত্তর বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। দুর্গাপুর ইস্পাত নগরীর টিএ বিল্ডিং (ইস্পাত কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ভবন) চত্বরে হাজারো মানুষ জড়ো হয়ে ইস্পাত কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল বহুস্তরীয়। প্রথমত, কোয়ার্টারের লাইসেন্স ও লিজ চুক্তি নিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। সিকিউরিটি ডিপোজিট এবং কোয়ার্টার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থেকে কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ অব্যাহতি নিচ্ছে। বহু পুরনো কোয়ার্টারগুলির বেহাল দশা ও পুনর্নির্মাণের অভাব বাসিন্দাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা—বিশেষ করে ২০০৮-২০০৯ সালের স্থগিত বেতন এবং অন্যান্য প্রাপ্য—এখনো পরিশোধ করা হয়নি। প্রাক্তন শ্রমিক ও তাদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার জন্যও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তৃতীয়ত, নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ, জল এবং সার্ভিস চার্জ পরবর্তী তিন মাস ধরে বকেয়া থাকায় বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছেন। এছাড়াও, পানীয় জল সরবরাহের ক্ষেত্রে সীমাহীন অব্যবস্থা লক্ষ করা যাচ্ছে।
বিক্ষোভ মঞ্চ থেকে একাধিক নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তব্য পেশ করেন। "ইস্পাত কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র মুনাফার দিকেই নজর দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। শ্রমিকদের অধিকার এবং নাগরিক পরিষেবার সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলন সংগঠিত হবে।"
বিক্ষোভের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পরিবেশ-সংক্রান্ত সমস্যা। এলাকায় শিল্পদূষণের কারণে জনজীবনে দুর্বিষহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। নাগরিক কমিটি দাবী জানিয়েছে, ইস্পাত কর্তৃপক্ষ তাদের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এদিন, বিক্ষোভকারীরা টিএ বিল্ডিং ঘেরাও করেন এবং তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। নাগরিক কমিটির নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কর্তৃপক্ষ যদি তাদের দাবিগুলি নিয়ে আলোচনা না করে এবং দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা না করে, তবে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের পথ বেছে নেবেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিক, নারী এবং তরুণ প্রজন্ম একযোগে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। উপস্থিত জনতার বক্তব্যে বারবার উঠে আসে বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস, যা শ্রমিক এবং সাধারণ নাগরিকদের প্রতি ইস্পাত কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে উন্মোচিত করে।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি শান্তিপূর্ণ হলেও পুলিশের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ইস্পাত নগরীতে জনজীবন প্রভাবিত হলেও বিক্ষোভকারীরা একবাক্যে জানান, "আমাদের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরব না।"
এই বিক্ষোভ শুধু দুর্গাপুর নয়, সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক আন্দোলনের নতুন দিশা দেখাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আগামী দিনে নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে আরও কঠোর পদক্ষেপের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
---সংবাদ প্রতিবেদন, দুর্গাপুর।




