বিশাল ১৬৭.৮ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প আঞ্চলিক উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
ভারত সীমান্তের কাছে তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো (ভারতে ব্রহ্মপুত্র নদ) নদীর উপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছে চীন। ভারতের অরুণাচল প্রদেশের কাছে নিংচি শহরে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং-এর উপস্থিতিতে এই বাঁধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এই প্রকল্পটি, যা "মোটুও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র" নামেও পরিচিত, এর আনুমানিক ব্যয় প্রায় ১৬৭.৮ বিলিয়ন ডলার (১৪.৪৬ লক্ষ কোটি টাকা), যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প।
মেগা বাঁধের বৈশিষ্ট্য:
অবস্থান: ইয়ারলুং সাংপোর (ভারতে ব্রহ্মপুত্র নদ) নিম্নধারায়, অরুণাচল প্রদেশের কাছে গ্রেট বেন্ডের কাছে।
আনুমানিক উৎপাদন: একবার সম্পূর্ণ হলে, এটি থ্রি গর্জেস ড্যামকে ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং বার্ষিক ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টার (kWh) বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
পরিমাণ: বাঁধটিতে পাঁচটি ক্যাসকেডিং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকবে, যা ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম।
বিনিয়োগ: আনুমানিক ১.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, প্রায় ১৬৭.৮ বিলিয়ন ডলার।
সময়রেখা এবং প্রেক্ষাপট:
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বেইজিং থেকে প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া যায়।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে নির্মাণ কাজ শুরু হয়, যা তিব্বত অঞ্চলে নবায়নযোগ্য শক্তি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে চীনের বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়।
এই স্থানটি ৫০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় ২,০০০ মিটার নাটকীয়ভাবে নেমে যাওয়ার কারণে বেছে নেওয়া হয়েছিল, যা বিশাল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনার প্রস্তাব দেয়।
ভারতের জন্য উদ্বেগ:
এই প্রকল্পটি ভাটির দেশগুলোতে, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে:
জল সুরক্ষা: উভয় দেশই নদীর জলের প্রবাহের উপর চীনের সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বিগ্ন, যা ভাটির কৃষি, জল সরবরাহ এবং জীবিকাকে প্রভাবিত করতে পারে।
পরিবেশগত ঝুঁকি: বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে বাঁধ সংবেদনশীল পরিবেশকে ব্যাহত করতে পারে, জীববৈচিত্র্যকে বিপন্ন করতে পারে এবং পলি প্রবাহকে পরিবর্তন করতে পারে – যার ফলে বন্যা বা খরা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি: বাঁধটি একটি পরিচিত টেকটোনিক জোনে অবস্থিত, যা ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, যেমনটি ১৯৫০ সালের আসাম-তিব্বত ভূমিকম্পে দেখা গিয়েছিল।
সাংস্কৃতিক প্রভাব: অরুণাচল প্রদেশের আদিবাসী সম্প্রদায় – যেমন আদি উপজাতি – নদীর প্রবাহে পরিবর্তন এবং বাঁধ থেকে হঠাৎ জল ছাড়ার সম্ভাবনার কারণে অস্তিত্বের হুমকির আশঙ্কা করছে।
সরকারি প্রতিক্রিয়া:
ভারত: ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের কাছে তাদের উদ্বেগ জানিয়েছে, ভাটির দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে নিজস্ব বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
চীনের অবস্থান:
চীন দাবি করেছে যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি পরিবেশগত সুরক্ষা এবং তিব্বত অঞ্চলের অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসবে। চীনা কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করেছে যে বাঁধের ভাটিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং তারা বজায় রেখেছে যে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ভারত ও বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়েছে।
মূল প্রকল্পের তথ্য সারণী:
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| অবস্থান | নিংচি, তিব্বত (ইয়ারলুং সাংপো/ব্রহ্মপুত্র) |
| আনুমানিক ব্যয় | ১৬৭.৮ বিলিয়ন ডলার (১.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান) |
| জলবিদ্যুৎ উৎপাদন | ৩০০ বিলিয়ন kWh/বছর |
| বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা | ৫টি ক্যাসকেডিং কেন্দ্র |
| আনুমানিক সমাপ্তি | অনির্দিষ্ট (নির্মাণ শুরু হয়েছে জুলাই ২০২৫) |
| প্রভাবিত দেশসমূহ | ভারত, বাংলাদেশ, চীন |
| প্রধান উদ্বেগ | জল নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ, ভূমিকম্প, ভাটির জীবিকা |
ব্যাপক প্রভাব:
নতুন বাঁধ দক্ষিণ এশিয়ার ভাগ করা নদীগুলির ভূ-রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। ভারত ও বাংলাদেশ প্রকল্পের পরিবেশগত এবং নিরাপত্তা প্রভাবগুলি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করায়, স্বচ্ছ সংলাপ, আন্তর্জাতিক জলপথ আলোচনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান আরও জোরালো হচ্ছে।


