নয়াদিল্লি: বিশ্ব প্রেক্ষাপট
বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা শিল্প এক বিশাল বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে কাজ করে। বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যেসব দেশ অস্ত্র তৈরি ও রপ্তানিতে এগিয়ে, তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণেও এই ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সমালোচকদের মতে, পুঁজিবাদী দেশগুলোর এই সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স (military-industrial complex) প্রায়শই বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত জিইয়ে রাখতে আগ্রহী হয়, কারণ যুদ্ধ বা অস্থিরতা তাদের অস্ত্র ব্যবসার জন্য নতুন বাজার তৈরি করে।
উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশগুলো একদিকে যেমন ইউক্রেনকে অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে, তেমনই তাদের নিজেদের প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর মুনাফা ও শেয়ারের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। এই প্রবণতা অনেক সময়ই শান্তির কূটনৈতিক সমাধানের চেয়ে সামরিক সমাধানকে উৎসাহিত করে। ভারত ঐতিহাসিকভাবে শান্তিকামী দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও, তার ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা রপ্তানি নীতি কি এই পুঁজিবাদী মডেলের দিকেই ইঙ্গিত করছে?
ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি: কূটনীতির নতুন হাতিয়ার?
ভারত বর্তমানে ৮০টিরও বেশি দেশে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি করে। এসব পণ্যের ক্রেতাদের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং আর্মেনিয়ার মতো দেশ রয়েছে। এই রপ্তানির মাধ্যমে ভারত কেবল বিদেশি মুদ্রা অর্জন করছে না, বরং কূটনৈতিক সম্পর্ককেও নতুন মাত্রা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে, ভারত তার অস্ত্র সরবরাহকে কৌশলগত অংশীদারিত্বের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।তবে এই নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।
নীতিগত ভারসাম্য: ভারত একইসাথে ঐতিহ্যগত মিত্র রাশিয়া এবং কৌশলগত অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ভারতীয় সংস্থা সম্প্রতি রাশিয়ায় সামরিক কাজে ব্যবহৃত বিস্ফোরক রপ্তানি করেছে, যা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এই ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেন ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে।
প্রতিরক্ষা শিল্পে ভারতের নতুন অধ্যায় - স্বনির্ভরতা এবং উদ্ভাবনের পথে
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। "আত্মনির্ভর ভারত" এবং "মেক ইন ইন্ডিয়া" নীতির হাত ধরে এই খাত বিদেশি আমদানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন এবং রপ্তানির দিকে মনোনিবেশ করেছে। এই বিশাল পরিবর্তনের মূলে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মূল খেলোয়াড়, তাদের ক্রমবর্ধমান রাজস্ব এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিপুল বিনিয়োগ।
প্রতিরক্ষা খাতের মূল খেলোয়াড়
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত - রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা (PSUs):
* ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড (BEL): এটি ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্স সংস্থা, যা রাডার, অ্যাভিওনিক্স, এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করে।
* হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (HAL): এটি ভারতের বিমান শিল্পের মেরুদণ্ড। যুদ্ধবিমান (যেমন তেজস) এবং সামরিক হেলিকপ্টার তৈরিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
* ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেড (BDL): মিসাইল এবং গোলাবারুদ উৎপাদনে এর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।
* মাজাগন ডক শিপবিল্ডার্স (MDL): যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন তৈরিতে এটি দেশের অন্যতম প্রধান সংস্থা।
বেসরকারি সংস্থা:
সাম্প্রতিক নীতি সংস্কারের পর থেকে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
* টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস লিমিটেড (TASL): এটি অ্যাভিওনিক্স, মিসাইল সিস্টেম এবং ইউএভি (ড্রোন) তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি টাটা-এয়ারবাসের যৌথ উদ্যোগে সামরিক বিমান তৈরির কারখানা উদ্বোধন করা হয়েছে।
* লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো (L&T): কামান (K9 বজ্র), যুদ্ধজাহাজ এবং রাডার সিস্টেম তৈরিতে এর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।
* ভারত ফোরজ: আর্টিলারি, সাঁজোয়া যান এবং উন্নত ধাতুবিদ্যা পণ্যের জন্য পরিচিত।
* আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস: ছোট অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং ড্রোন সিস্টেম তৈরিতে সংস্থাটি ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।
রাজস্ব এবং আর্থিক বৃদ্ধি
ভারতের প্রতিরক্ষা খাতের প্রবৃদ্ধি খুবই দ্রুত।
প্রতিরক্ষা বাজেট: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রতিরক্ষা খাতে ৬.৮১ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
রেকর্ড উৎপাদন: ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে প্রতিরক্ষা উৎপাদন রেকর্ড ১.২৭ লক্ষ কোটি টাকা ছুঁয়েছে, যা ২০১৪-১৫ সালের তুলনায় ১৭৪% বেশি।
রপ্তানি বৃদ্ধি: প্রতিরক্ষা রপ্তানি ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ২৩,৬২২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা গত এক দশকে ৩৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই রপ্তানির মধ্যে ৬৪.৫% অবদানই বেসরকারি সংস্থার।
গবেষণা এবং উন্নয়ন (R&D)
প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরতার মূল ভিত্তি হলো গবেষণা ও উন্নয়ন।
DRDO-এর ভূমিকা: প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) ভারতের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রধান স্তম্ভ। এটি অগ্নি, পৃথ্বী, আকাশ-এর মতো মিসাইল সিস্টেম থেকে শুরু করে তেজস যুদ্ধবিমান এবং অর্জুন ট্যাঙ্কের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে।
বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ: সরকার R&D-তে বেসরকারি ও স্টার্ট-আপ সংস্থাগুলোকে উৎসাহিত করছে। প্রতিরক্ষা বাজেটের একটি অংশ (প্রায় ২৫%) বেসরকারি R&D-র জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে। এতে নতুন নতুন উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি বিকাশে গতি আসছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প কেবল একটি বাণিজ্যিক খাত নয়, এটি দেশের কৌশলগত স্বনির্ভরতার প্রতীক। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, ক্রমবর্ধমান রাজস্ব এবং গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগের ফলে ভারত ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি এবং প্রতিরক্ষা রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে।

