ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে সাহসী মশাল হাতে নিয়ে বিপ্লবের পথে হেঁটেছিলেন, সেই আদর্শবান সংগঠক, দূরদর্শী লেখক এবং আমাদের প্রিয় 'কাকাবাবু' কমরেড মুজাফফর আহমদের জন্মদিনে জানাই অকৃত্রিম লাল সেলাম। তাঁর নাম শুধু ইতিহাসের পাতায় লেখা নয়, তা লক্ষ লক্ষ সংগ্রামী মানুষের হৃদয়ে চিরজাগরুক।
যে পথচলা স্বপ্ন বুনেছিল এক নতুন ভারতের
১৯২২ সালের পর কমরেড আব্দুল হালিম ও 'কাকাবাবু'র উদ্যোগে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টির বীজ বপন করা হয়েছিল। এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক দল গঠনের প্রচেষ্টা ছিল না; এটি ছিল এক নতুন দিনের স্বপ্ন, যেখানে শোষণের কোনো স্থান থাকবে না। তিনি একা নন, তাঁর সঙ্গে ছিলেন শ্রীপতি অমৃত দত্ত, গোলাম হোসেন, সিরাজাতুল্লাহ ও প্রমথ-এর মতো অগণিত যোদ্ধা, যারা সারা ভারতজুড়ে এই স্বপ্নের শিখা প্রজ্বলিত করেছিলেন। তাঁরা জানতেন, এই পথ কণ্টকাকীর্ণ, তবুও তাঁরা পিছিয়ে আসেননি।
জীবন উৎসর্গ, জেলজীবন ও অবিচল সংগ্রাম
১৯২৩ সালের ১৬ মে কাকাবাবুকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করা হয়, কিন্তু তাঁর কণ্ঠরোধ করা যায়নি। ১৯২৪ সালে বলশেভিক বিপ্লবের অভিযোগে আবার তাঁকে বন্দি করা হয়। টানা চার বছর তিনি আলিপুর, প্রেসিডেন্সি, কানপুর ও রায়বেরেলির অন্ধকার কারাগারে কাটিয়েছেন। সেই সময়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, কিন্তু তাঁর সংগ্রামী মন কখনও হার মানেনি। ১৯২৭ সালে কুখ্যাত মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় আবারও তাঁর জীবন বন্দি হয়। ১৯৩৩ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও আপিলে সেই সাজা কমে তিন বছর হয়। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, আদর্শের জন্য লড়াইয়ে শারীরিক কষ্ট বা কারাবাসের ভয় জয় করা সম্ভব।
নেতৃত্বের শিখরে, কিন্তু মাটিতেই তাঁর শেকড়
১৯৩৭ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনি অল ইন্ডিয়া কিসান সভার সভাপতি ও উপ-সভাপতি হিসেবে কৃষকদের অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন। ১৯৪৩ সালে প্রথম পার্টি কংগ্রেসে তাঁর হাতেই উঠেছিল বিপ্লবের লাল পতাকা। ১৯৪৮ ও ১৯৬৪ সালের ঐতিহাসিক পার্টি কংগ্রেসে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু সেই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব ছিল দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং একই সাথে ছিল মাটির মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা।
লেখনী ছিল তাঁর দ্বিতীয় অস্ত্র
কমরেড মুজাফফর আহমদ কেবল একজন বিপ্লবী ছিলেন না, ছিলেন এক অসাধারণ লেখকও। তাঁর লেখা 'আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি', 'ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার প্রথম যুগ', 'কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি কথা'–এর মতো বইগুলো শুধু ইতিহাসের দলিল নয়, এগুলো এক সংগ্রামীর হৃদয়ের স্পন্দন। এই লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পাশাপাশি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক চেতনার গভীরে আলো ফেলেছেন।
এক সাধকের সহজ জীবন
কমরেড মুজাফফর আহমদের ৮৪ বছরের জীবন ছিল সাধকের মতো। পার্টির জন্য জীবন উৎসর্গ করলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন নির্লোভ ও নিরহংকার। পার্টির ভাড়া করা সামান্য ঘরে তাঁর দিন কেটেছে, অভাবের মধ্যেও নিজের জন্য কিছুই রাখেননি। তাঁর কাছে পার্টিই ছিল জীবন, আর সেই জীবনের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ছিল অতুলনীয়। ১৯৭৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর এই মহান বিপ্লবীর জীবনাবসান হয়, কিন্তু তিনি আজও আমাদের প্রেরণার উৎস।
উপসংহার
কমরেড মুজাফফর আহমদ এক বিপ্লবী নাম যা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে মিশে আছে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে কীভাবে একটি দেশকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে তার মানুষের জন্য লড়াই করতে হয়। তাঁর জন্মদিনে আমরা শপথ নিই, তাঁর দেখানো পথেই আমরা হেঁটে চলব। তাঁর স্মৃতি অমর।

.jpeg)
