কাঠমান্ডু: নেপালে জেন-জি (Gen-Z) তরুণদের নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভ যখন সরকারকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে, তখন এর পেছনে বিদেশি শক্তির ইন্ধন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের একটি অংশের নীরবতা এবং একই সময়ে কিছু বিশ্লেষকের মন্তব্য এই সন্দেহকে আরও জোরালো করছে যে, এই আপাত স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলন সম্ভবত একটি সুপরিকল্পিত 'রঙিন বিপ্লব'-এর অংশ, যা নেপালের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসতে চায়।
মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও নেপালের বিক্ষোভ
নেপাল এমন একটি দেশ যা দুটি বৈশ্বিক শক্তির কেন্দ্র, ভারত এবং চীনের মাঝে অবস্থিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এর মতো প্রকল্প এবং নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির বেইজিং-ঘনিষ্ঠ নীতির কারণে নেপালে চীনের প্রভাব বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে, নেপালের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভাঙা এবং চীনপন্থী সরকারকে অপসারণ করা যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জন-অসন্তোষকে পুঁজি করে একটি সরকার-বিরোধী আন্দোলনকে উসকে দেওয়ার মার্কিন 'রঙিন বিপ্লবের' ছক নতুন কিছু নয়। অতীতে ইউক্রেন, জর্জিয়া এবং বেলারুশের মতো দেশগুলোতেও এমন 'জনআন্দোলন'-এর আড়ালে পশ্চিমের হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে।
সুপরিকল্পিত কৌশলের লক্ষণ
বিক্ষোভের পদ্ধতি এবং প্রতীকী চিহ্নগুলো এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রতীক, যা বিভিন্ন দেশে পশ্চিমাপন্থী 'রঙিন বিপ্লব'-এর একটি সাধারণ চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, নেপালের বিক্ষোভকারীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। এছাড়া, ২০২৩ সালে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ডের কাঠমান্ডু সফরকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন। নুল্যান্ডের সফরটি এমন সময়ে হয়েছিল, যখন নেপালে মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডি (USAID) তাদের কার্যক্রম বাড়াচ্ছিল। ইউএসএআইডি'র মতো সংস্থাগুলো দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসনের প্রসারে কাজ করার নামে স্থানীয় এনজিও এবং সুশীল সমাজকে অর্থায়ন করে আসছে, যা প্রায়শই সরকার-বিরোধী বিক্ষোভের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে বলে সমালোচকরা অভিযোগ করেন।
অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কি শুধু একটি অজুহাত?
বিক্ষোভের সমর্থকরা বলছেন, এর মূল কারণ দেশের ব্যাপক দুর্নীতি, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর জনগণের আস্থা হারানো। তবে সমালোচকরা মনে করেন, এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোই বিদেশি শক্তির জন্য হস্তক্ষেপের আদর্শ ক্ষেত্র তৈরি করে। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভকে চতুরতার সঙ্গে ব্যবহার করে তাকে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে চালিত করা হয়, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন। নেপালের ক্ষেত্রেও তেমনই ঘটনা ঘটছে বলে অনেকে মনে করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করার মতো একটি ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন যেভাবে হঠাৎ করে তীব্র রূপ নিয়েছে, তা এক পরিকল্পিত উসকানির ইঙ্গিত দেয়।
এখন পর্যন্ত নেপালের এই বিক্ষোভকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অর্থায়ন করেছে এমন কোনো প্রমাণ না থাকলেও, এই আন্দোলনের পেছনে বিদেশি শক্তির ইন্ধনের অভিযোগকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সুনির্দিষ্ট প্রতীক ব্যবহার এবং মার্কিন আধিপত্য বিস্তারকারী সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে নেপালের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা হয়তো কেবলই স্থানীয় অসন্তোষের ফল নয়, বরং একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক খেলার অংশ।
নেপালের রাজনৈতিক ঝড়ের আড়ালে মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা!


